বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মানবাধিকার রেকর্ড ও দলীয় নেতাদের প্রতি দলটির প্রশ্নাতীত বন্দনার কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ লেবার দলীয় এমপি রূপা হক।

রূপা হক এমপি: বাংলাদেশ একটি “দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র” নেত্র নিউজ February 16, 2020

রূপা হক এমপি। ফটো : বেটিনা স্ট্রেনস্কি /আলামি লাইভ নিউজ

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত চার বৃটিশ এমপির একজন রূপা হক। আওয়ামী লীগের শাসনাধীন বাংলাদেশকে “দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র” (rogue state) হিসেবেও বর্ণনা করেছেন তিনি। এছাড়াও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে তুলনা করার সময় কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনের সংঘাতের প্রসঙ্গও তুলেছেন।

৪ঠা ফেব্রুয়ারি বৃটিশ আইনসভা হাউজ অব কমন্সে আয়োজিত লেবার ক্যাম্পেইন ফর হিউম্যান রাইটসের এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন বৃটেনের ইলিং সেন্ট্রাল এন্ড অ্যাক্টন আসন থেকে নির্বাচিত ব্রিটিশ লেবার পার্টির এই এমপি।বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাটা নাগরিকদের জন্য যেভাবে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার, তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রূপা হক, আর সমালোচনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় ন্যারেটিভেরও।

অতীতেও অবশ্য রূপা হক বাংলাদেশ সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের গ্রেপ্তার নিয়ে তিনি সরব হয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ কোন এমপির এভাবে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনায় মুখর হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রূপা হক বলেন, “এই মুহূর্তে এটি কোন স্বাভাবিক দেশ নয়, আমি মনে করি [দেশটি] এক ধরণের দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বা কাছাকাছি [কিছুতে পরিণত হয়েছে]।”

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, “মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার পরিমাপের সকল সূচক বা মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন খুবই নিপীড়নমূলক একটি রাষ্ট্র। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক, কেননা দেশটির মূল সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এমনকি সমাজতন্ত্র এই শব্দগুলোও ছিল। কিন্তু এখন এটি অত্যন্ত কঠোর ও কর্তৃত্বপরায়ণ একটি ক্ষমতাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।”

রূপা হক জানান তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ সফর করেছেন ২০১৭ সালে, লেবার ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের আয়োজনে। ওই সংগঠনটি সাধারণত বাংলাদেশে গিয়ে সোজাসাপ্টা সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বৃটিশ এই এমপি ওই উন্মুক্ত সভায় আরও বলেন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একসময় ক্ষমতার পালাবদল ঘটতো। “কিন্তু এখন একদিকেই দেশটি আটকে আছে, কেননা অপর পক্ষের সবাইকে জেলে ঢুকানো হয়েছে,” যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অগ্রাহ্য করা উচিত নয় মত দিয়ে তিনি বলেন, “আমি অবশ্য আশাবাদী যে [পরিস্থিতি হয়তো ভালোর দিকে যাবে]। কারণ, আমার শৈশবকালে, আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন উত্তর আয়ারল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকায় যা হচ্ছিল, তা কখনই সমাধান হবে না বলেই মনে হতো। কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনের সংকটের কথা হয়তো এক্ষেত্রে বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু [বাংলাদেশে] মানবাধিকারের এই ট্র্যাজেডি আমরা অগ্রাহ্য করলে আমাদেরই বিপদ হবে।”

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিয়ে নিজের সূচনা বক্তব্যে রূপা হক দলীয় নেতাদের প্রতি আওয়ামী লীগের প্রশ্নাতীত বন্দনারও সমালোচনা করেন। এ সময় ২০১৭ সালে বাংলাদেশে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন তিনি। তার ভাষ্য, “সেখানকার স্টাফরুমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার বাবার বিরাট বড় ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। আমার তখন মনে হলো যে কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফরুমে উইন্সটন চার্চিল বা তখনকার প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ছবি টাঙানো থাকবে এমনটা আমরা চিন্তাও করতে পারিনা। আমার কাছে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত অশুভ মনে হয়েছে।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে “জাতির পিতা” বলা হয়, তাকে নিয়ে নির্দিষ্ট করে রূপা হক বলেন, “এই জাতির পিতা সংক্রান্ত বিষয়টি আমাকে কিছুটা চমকে দিয়েছিলো।”

২০২০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বছরব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশে “জাতির পিতা”-র বিরুদ্ধে “অপপ্রচার” বা “প্রচারণা” ছড়ানো ফৌজদারি অপরাধ, যার সাজা সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড।

এই জন্মবার্ষিকী সম্পর্কে রূপা হক বলেন, “আমি এই মার্চে এখানে হাউজ অব কমন্সের একটি ডাইনিং হলে জাতির পিতার জন্মদিন উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়েছি। আমি শুধু এটুকুই বলবো যে আমি আপনাদের এই বর্ণনা (ন্যারেটিভ) মানিনা যে এই লোকটি জাতির পিতা।”

২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তারা বিমানবন্দরের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলেছে। সব ভয়ানক সব কাণ্ড করেছে। মনে হয় তারা যেন আগের ইতিহাস মুছে ফেলার কাজে নেমে পড়েছে।” প্রসঙ্গত, নাম পরিবর্তনের আগে বিমানবন্দরটির নাম আওয়ামী লীগের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের নামে রাখা হয়েছিল।

লেবার ক্যাম্পেইন ফর হিউম্যান রাইটস ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল মূলত “বৃটেন অ্যান্ড বাংলাদেশ” শিরোনামের একটি প্রকাশনাকে কেন্দ্র করে। এই প্রকাশনার উদ্দেশ্য বাংলাদেশ নিয়ে লেবার পার্টির নীতিমালা ও অবস্থান নির্ধারণে সাহায্য করা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ও চেয়ার ম্যাথিউ টার্নার। অনুষ্ঠানে আরও যারা বক্তব্য রাখেন তাদের মধ্যে ছিলেন ব্র্যাক ইউকের বোর্ড সদস্য ও গ্রেটার লন্ডন অ্যাসেম্বলির সাবেক লেবার সদস্য মুরাদ কোরেশী, সামাজিক নীতিমালা ও ত্রাণ বিশেষজ্ঞ হালিমা বেগম, ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলমের বোন কাজী নাজমা করিম, ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক রুমানা হাশেম, সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান (নেত্র নিউজের ইংরেজি বিভাগের সম্পাদক)।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কেন সোচ্চার হতে চান, তার ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে রূপা হক ওই অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, “আমি ইলিং সেন্ট্রাল এন্ড অ্যাক্টন থেকে নির্বাচিত লেবার এমপি। কিন্তু আপনি যদি আমার মতো বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি যেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সংসদীয় আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন, তার চেয়েও বৃহত্তর [জনগোষ্ঠীর] এমপি। আপনি আসলে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশী ডায়াসপোরার [প্রবাসী জনগোষ্ঠী] একজন এমপি।”

এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করেছে নেত্র নিউজ। তবে এই সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত হাইকমিশনের কোন জবাব পাওয়া যায়নি।●