আগ্রাবাদের চক্র পুকুর গিলছে মাটি ফেলে, ৪০ ভাগ ভরাট রাতারাতি (ভিডিও)
শেষ সময়ে পরিবেশের অভিযানে দুজন ধরা
পুকুর ও জলাশয় ভরাট আইন লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের সমবায় সিঙ্গাপুর মার্কেটের পেছনে ভরাট করা হচ্ছে একটি পুকুর। ‘সরকার বাড়ি পুকুর’ নামের ওই পুকুরটির ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে স্থানীয় নিম্ন আয়ের কয়েকশত পরিবারে ধোয়া-মোছাসহ নিত্যব্যবহার্য পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। এছাড়া অগ্নিকাণ্ড ও যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে এলাকায় পানির সংকট দেখা দেবে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুকুর ভরাটের অভিযোগ পেয়ে মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক মো. মনির হোসেন। সেখানে গিয়ে দখলদারদের বাধার মুখে পড়েন তিনি। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে হালিশহর থানা পুলিশ। আটকরা হলেন মো. আকরাম (৩০) ও মো. সোহাগ (৩২)।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) এর ৬(ঙ) অনুযায়ী, জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর ভরাট করা যাবে না। প্রাকৃতিক জলাধার আইন-২০০০ অনুসারে-পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ভরাট করা বেআইনি। একই আইনে পুকুরের মতো কোনো প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ এ আইন অমান্য করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
অথচ এসব আইনের তোয়াক্কা না করেই গত চারদিন ধরে সরকারি বাড়ি পুকুরটি ভরাট করছে মালিকদের একটি পক্ষ।
সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, পুকুরটি দ্রুত ভরাট করা হচ্ছে। পুকুরটির একাংশে বাঁশ ও বেড়া দিয়ে ঘেরা দেওয়া হয়েছে। কিছু শ্রমিক পাশের একটি জায়গা থেকে বালু এনে পুকুরটি ভরাটের কাজ করছেন। পুকুরটির আশপাশে অন্তত কয়েকশ’ পরিবার বসবাস করছে। যাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের লোক। পুকুরের আশপাশে ভাড়ায় থাকা পরিবারগুলো এমনিতেই রয়েছে চরম পানি সংকটে। লাইনে পানি না পেলে বেশিরভাগ সময় বাসিন্দারা পুকুরটি থেকে ধোয়া-মোছাসহ নিত্য ব্যবহারে পানি সংগ্রহ করে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই পুকুরটির মালিক দুটি পক্ষ। এদের একটি পক্ষ মোহাম্মদ জিসান ও মো. জনি নামের দুই ভাই এবং পারভেজ নামের তাদের এক মামাতো ভাই। তারা পৈত্রিক ও মায়ের কাছ থেকে ওই অংশটি পেয়েছেন। অপর পক্ষের মালিক রাশেদা আক্তার, সাইফুল ইসলাম ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। ক্রয়সূত্রে তারা ওই অংশের মালিক। মূলত জিসান, জনি ও পারভেজ মিলেই পুকুরটি ভরাট করে পুকুরের অধিকাংশ দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। দখলদাররা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় বাসিন্দাদের কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায় পুকুরটির প্রায় ৪০ শতাংশ ভরাট করা হয়েছে। এ সময় দু’জনকে আটক করে পুলিশ। আটক দু’জনসহ মূল অভিযুক্ত জায়গার মালিক মো. জনি ও মো. জিসানকে আসামি করে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।’
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মো. জিসান জানান, ‘এটা আমাদের নিজস্ব জায়গা। এখানে ভাড়া ঘর আছে। বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুকুরের কিছু অংশ ভরাট করা হচ্ছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়ে পুকুরটি ভরাট করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে পুকুরের আরেক মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িত নই। চারদিন আগে বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছি।’
২০০৬-০৭ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ জরিপ মতে চট্টগ্রামে চার হাজার ৫২৩টি পুকুর থাকার কথা। গত দেড় যুগে কমতে কমতে পুকুরের সংখ্যা প্রায় হাজারখানেকে এসে ঠেকেছে। পুকুর না থাকায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আগুন লাগলে নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের।
ডিজে/সিপি