চট্টগ্রামে বালুমহাল ইস্যুতে টানাপোড়েন, বন্দরের অনুমোদন থাকলেও থমকে ড্রেজিং
পুলিশ–ব্যবসায়ী দ্বন্দ্বে কর্ণফুলী নিয়ে শঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের অনুমোদন, সরকারি রাজস্ব পরিশোধ এবং চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদীতে কয়েকটি বৈধ প্রতিষ্ঠানের ড্রেজিং ও বালি উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) নির্দেশনার কারণে তাঁদের কাজ কার্যত থমকে আছে। এতে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, নতুনব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার অবৈধ বালুমহাল সচল রয়েছে।
গত ৩ মার্চ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে দেওয়া দুটি পৃথক আবেদনে চারটি প্রতিষ্ঠান এ অভিযোগ তুলে ধরেছে। আবেদনকারীরা বলেছেন, সব ধরনের লাইসেন্স ও চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বৈধ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ড্রেজিং কাজ শেষ না হলে নদীর নাব্যতা কমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বৈধ কার্যক্রম বন্ধের অভিযোগ
এসএডি-তাজ (জেভি) শাহ আমানত ডকইয়ার্ড, মেসার্স মহি উদ্দিন এন্টারপ্রাইজ, এমএস-এমইউ (জেভি) এবং তাজ এন্টারপ্রাইজ নামে চারটি প্রতিষ্ঠান তাদের আবেদনে জানিয়েছে, তারা সরকারি বিধি মেনে এবং রাজস্ব পরিশোধ করে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় বালি ও মাটি উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে সংশ্লিষ্ট থানাগুলো মৌখিক ও লিখিত নির্দেশে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলে।
এই নির্দেশ মেনে চলতে গিয়ে মাসের পর মাস কাজ বন্ধ রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানগুলোর। ফলে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং কার্যক্রমও থমকে আছে। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে এবং চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা না গেলে নদীর নাব্যতা কমে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৮ মে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ চুক্তিনামা নম্বর ১৩-২৫ এর মাধ্যমে এসএডি-তাজ (জেভি)-কে কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে নির্ভীক জেটি থেকে নৌ-পুলিশ কেন্দ্রের পূর্ব পর্যন্ত ‘কাটিং বেন্ড জোন’-এ সংরক্ষণমূলক ড্রেজিংয়ের অনুমতি দেয়। প্রায় ৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার এ প্রকল্পে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ ঘনমিটার বালি ও মাটি উত্তোলনের কথা রয়েছে। শর্ত অনুযায়ী গ্র্যাব ড্রেজারের মাধ্যমে উত্তোলিত বালি ও মাটি বাল্কহেড ও হুপারের মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপসারণ করতে হবে এবং তা নদী বা সাগরে ফেলা যাবে না। প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর।
এ ছাড়া গত ১৪ জুলাই মহি উদ্দিন এন্টারপ্রাইজকে আউটার বার এলাকায় নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনা খরচে ড্রেজিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়, যেখানে দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ড্রেজিং বাধ্যতামূলক। ১৯ আগস্ট এমএস-এমইউ (জেভি)-কে পোর্ট লিমিটের ভেতরের খালসমূহে পানি প্রবাহ বজায় রাখতে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মেয়াদও এক বছর। আবেদনকারীরা এসব কার্যাদেশ, চিফ হাইড্রোগ্রাফারের অনুমোদনপত্র এবং ইজারা চুক্তির কপি আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন।
তাদের দাবি, বন্দরের নির্দেশনা অনুযায়ী ড্রেজিং শেষে উত্তোলিত বালি ও মাটি নির্ধারিত স্থানে অপসারণ না করলে মোহনায় পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যেতে পারে। এতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধের অভিযোগ
অন্য এক আবেদনে মেসার্স বাকলিয়া সেইলস সেন্টার জানিয়েছে, দেশীয় প্রযুক্তির মিনি ড্রেজারের মাধ্যমে উত্তোলিত বালি তারা বিক্রি করে থাকে। তাদের দাবি, গত ৯ নভেম্বর প্রশাসনের একটি দল বিক্রয়কেন্দ্রে এসে বালি বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরে গত ১২ নভেম্বর কমিশনারের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করা হলেও এখনো কোনো অনুমতি পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বন্দর ইজারা ও যন্ত্রাংশ ব্যয়সহ মোট ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮০ টাকার ক্ষতির বিষয়টি তারা গত ১ মার্চ লিখিতভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। বিক্রি পুনরায় শুরু করতে গেলেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিক্রয়কেন্দ্রটি বাকলিয়ার রাজাখালী নোমান কলেজ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।
পুলিশের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোলাইমান এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন বলেন, পুলিশ কমিশনারের নির্দেশেই অবৈধ বালুমহাল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বন্দরের অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করা হচ্ছে না।
তারা বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে এবং পুলিশ সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। রাতে কোনো বালিবাহী ট্রাক পাওয়া গেলে ট্রাফিক আইনে মামলা করা হয়। বন্দরের চুক্তিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কোনো কারণে অসন্তুষ্ট হন, তাহলে তারা সিএমপি কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।
নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনের আগে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে বালুমহালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। এরপর প্রায় এক মাস পার হলেও বন্দরের অনুমোদনে পরিচালিত ড্রেজিং ও বালি উত্তোলন কার্যক্রম কেন বন্ধ রয়েছে—সে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ভোরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে দুই ব্যক্তি নিহত হন। মোটরসাইকেলে এসে একদল সন্ত্রাসী একটি প্রাইভেট কারকে ধাওয়া করে এ হামলা চালায়। এতে গাড়ির চালক ও এক যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, বালুমহাল দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব এবং পূর্বশত্রুতাই এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করেছে। ওই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচনের আগে বৈধ ও অবৈধ সব বালুমহালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেয় সিএমপি।
তবে পরবর্তী সময়েও নগরীতে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২৫ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় গুলিতে নিহত হন কথিত সন্ত্রাসী আলী আকবর ওরফে ‘ঢাকাইয়া আকবর’। আবার গত ৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সরোয়ার হোসেন বাবলাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রায় দুই দশক ধরে বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নির্দেশে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং নির্মাণ খাতে প্রভাব বিস্তারের মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই নগরীর বায়েজিদ থানার চালিতাতলী এলাকায় সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, অন্য এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও সেখানে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি। অথচ বাকলিয়া ও কোতোয়ালী এলাকায় বন্দরকেন্দ্রিক বৈধ ব্যবসা বন্ধ রাখা হয়েছে কেন—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ, অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ, দক্ষিণ জোনের উপকমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া এবং সদর জোনের উপকমিশনার ফেরদৌস আলী চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁদের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার এবং জনসংযোগ ও মিডিয়া শাখার দায়িত্বে থাকা আমিনুর রশীদ বলেন, বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে পরে সিএমপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মন্তব্য জানাতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘বৈধ কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুলিশ হয়রানি করার কথা নয়।’
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক জানান, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং এবং খাল খননের কাজ চলছে। চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মুখে ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ফিশারিঘাট, জোবায়ের খাল, লইট্টা খাল, বিএফটি খাল, অভয় মিত্র খাল এবং পিকে সেন খালের মুখে খননকাজ করা হয়েছে। ড্রেজারের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদী থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার ঘনমিটার মাটি তোলা হচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান (এইচ২) বিএন বলেন, প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে চার কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং ও খাল খনন চলছে। ইতোমধ্যে নদীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিনের স্তর অপসারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বন্দরের অনুমোদিত ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ থাকলে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কী প্রভাব পড়তে পারে—সে প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসনের কাছেই জানতে চায় সংশ্লিষ্ট মহল।
সিপি



