জামায়াতের প্রচারণায় এআই ‘ভোটার’ ফেসবুক বিজ্ঞাপনে ভুয়া সমর্থক, বাস্তব নয় কেউ
রাবেয়া খাতুন কে বা কারা, জানে না কেউ
নির্বাচনী প্রচারণায় বাস্তব মানুষের মতো নাম ও পেশাসহ ‘ভোটার’ দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ছবি ছড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি ফেসবুক পেজ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছবির এসব মানুষ আদতে বাস্তব নন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা হতে পারে এসব মুখ। সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজে সুবিনয় মুস্তফী ইরনের এক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট পেজ ও বিজ্ঞাপনে এমন ডজনখানেক ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার নিয়মভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অস্তিত্বহীন ভোটার ও এআইয়ের কারসাজি
নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে দুই ডজনেরও বেশি ছবি প্রচার করা হয়েছে। এসব ছবিতে সাধারণ ভোটারদের নাম ও পেশা উল্লেখ করে তাদের মুখ দিয়ে দলটির পক্ষে সাফাই গাওয়ানো হয়েছে। তবে কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ব্যক্তিরা আদতে রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ নন, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি।

‘রাবেয়া খাতুন’ আসল নন!
২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রকাশিত এক পোস্টে ‘মিসেস রাবেয়া খাতুন, স্কুলশিক্ষক’ পরিচয়ে এক নারীর ছবি ব্যবহার করা হয়। ছবির ওপর লেখা ছিল, ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন কেন?’ নিচে জবাব হিসেবে যুক্ত করা হয়, ‘ওদের ছেলেরা আমার মেয়েকে বিরক্ত করে না।’ দাঁড়িপাল্লা জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রতীক।

এই একই ছবি আলাদাভাবে শেয়ার করেন জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক এবং দলের আন্তর্জাতিক মুখপাত্র পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ নকিবুর রহমানও রয়েছেন।
কারিগরি পরীক্ষায় মিলল প্রমাণ
গুগলের এআই ডিটেকশন টুল ‘জেমিনি’ ব্যবহার করে রাবেয়া খাতুনসহ অন্তত আটটি ছবিতে এআই ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে নেত্র নিউজ। এর মধ্যে ‘রাবেয়া খাতুন’–এর ছবিটিও রয়েছে। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘উইটনেস’-এর সহায়তা নেওয়া হয়। সংস্থাটির ডিপফেক র্যাপিড রেসপন্স ফোর্সের চারটি দল আলাদাভাবে এসব ছবি বিশ্লেষণ করে ‘ভেরি লাইকলি জেনএআই’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
উইটনেসের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বিষয়ক গবেষক জুজানা ওয়োজিয়াক এক বিবৃতিতে নেত্র নিউজকে জানান, তিনটি দল ছবিগুলোতে এআই ব্যবহারের শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছে। একটি দলের ফলাফল কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও বাকি তিনটি দলের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়েছে।
অস্বীকার করে উধাও, বিজ্ঞাপনদাতার রহস্যময় ভূমিকা
নেত্র নিউজের পক্ষ থেকে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ ও ‘আওয়ার লিডার—আমাদের নেতা’ নামের পেজ দুটির বিজ্ঞাপনদাতা হিসেবে বেলাল হোসেন ইথুন নামের এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। নেত্র নিউজ তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এআই ব্যবহারের দাবি অস্বীকার করেন। বেলাল হোসেন জানান, তাদের নিজস্ব গ্রাফিক ডিজাইনার রয়েছে। তবে তার মক্কেলদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা বলে পরবর্তীতে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং হোয়াটসঅ্যাপে নেত্র নিউজের প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।
বেলালের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি জামায়াতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘হ্যালো আওয়ার লিডার: আমিরে জামাতের সঙ্গে জেন-জি’ এবং ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এর মতো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তাকে সংগঠকের পরিচয়পত্র পরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এছাড়া উমর শরীফউল্লাহ হাসিব নামের এক মার্কেটিং প্রফেশনালও এই পেজগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির শফিকুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারযানের ভেতর থেকে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া তাকে তিনি ‘Our Leader – আমাদের নেতা’ পেজের সঙ্গে যৌথ পোস্টও করতে দেখা গেছে। হাসিব এআই ব্যবহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নেত্র নিউজের প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন।
একই ছকে তৈরি বহু ‘ভোটার’
নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাবেয়া খাতুনের মতো আরও অনেক ছবিতে ফল বিক্রেতা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিল্পপতি বা নারী শিক্ষার্থীর পরিচয়ে মানুষ দেখানো হয়েছে। প্রতিটি ছবিতে নাম ও পেশা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কেন তিনি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ভোট দেবেন।
একই পেজ থেকে আরেক সিরিজের ছবিতে রাস্তাঘাট, বাজার ও শ্রেণিকক্ষে তথাকথিত ভোটারদের দেখানো হয়েছে। একটি ছবিতে ‘নওশিন তানজিম, শিক্ষার্থী’ নামে এক মেয়েকে ট্যাবলেট ও খাতা হাতে ঝাপসা শ্রেণিকক্ষের পটভূমিতে দেখানো হয়। ইনস্টাগ্রামে যুক্ত একটি অ্যাকাউন্টে প্রায় একই অবয়বের আরেকটি ছবি পাওয়া যায়, সেখানে সামান্য ভিন্নতায় হিজাব পরা দেখা যায়।
নেত্র নিউজ যোগাযোগ করার পর ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ পেজ থেকে রাবেয়া খাতুনের পোস্ট ও ইথুনের ফোন নাম্বার সরিয়ে ফেলা হয়। তবে একই ধরনের অন্য ছবিগুলো এখনও অনলাইনে রয়েছে।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর তৈরি হওয়া এই পেজটি বিভিন্ন মূল্যমানের মোট ২৬টি বিজ্ঞাপন চালিয়েছে। জামায়াতের অন্তত চারটি সহযোগী অ্যাকাউন্ট, যাদের মোট অনুসারী দুই লাখ ৪৩ হাজারের বেশি, এসব পোস্ট শেয়ার করেছে। ফরিদপুর-৪ আসনের প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন একটি পোস্ট শেয়ার করেন। মীর আহমদ বিন কাসেম দুটি পোস্ট শেয়ার করেন।
যা বললেন প্রার্থীরা
ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেমও এই ধরনের কিছু ছবি শেয়ার করেছিলেন। নেত্র নিউজকে তিনি জানান, ওই পেজগুলোর পরিচালকদের তিনি চেনেন। তার দাবি, ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা বাস্তব, তবে তারা সাক্ষাৎকারে দিতে রাজি নন।
বিন কাসেম প্রথমে বলেন, তিনি দেখবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের তথ্য শেয়ার করতে সম্মতি দেন কি না। পরে জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা পরিচয় গোপন রাখতে চান। তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, দলের সিদ্ধান্ত নয়। যদিও জামায়াত আমিরের সঙ্গে প্রচারণায় থাকা ওমর শরিফুল্লাহ হাসিব তার কর্মকাণ্ড বিষয়ে প্রশ্ন জামায়াতের কাছেই পাঠিয়েছেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি ও ঝুঁকি
নির্বাচনী প্রচারণায় অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন। কোনো দল বা প্রার্থী যদি এআই-তৈরি কনটেন্ট ছড়ায়, তবে তা বিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে। নিয়মে বলা হয়েছে, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে প্রচারণার জন্য অসৎভাবে এআই ব্যবহার করা যাবে না।
ঢাকাভিত্তিক তথ্য সুরক্ষা বিষয়ক থিংক ট্যাংক ‘ডিজিটালি রাইট’-এর প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী নেত্র নিউজকে বলেন, নির্বাচনের সময় এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, এটি এক ধরনের সমন্বিত এবং কৃত্রিম প্রচারণা যা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনী কাজে অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জামায়াত যদি দলগতভাবে এই কাজে যুক্ত থাকে, তবে তা বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন চক্রে এআইয়ের এমন ব্যবহার নজিরবিহীন। এর আগে ভুয়া ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে প্রার্থীদের নাম প্রত্যাহারের গুজব ছড়ানোর মতো ঘটনা ঘটলেও এবার বড় পরিসরে অস্তিত্বহীন ভোটার তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।



