চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়ায় দেশীয় অস্ত্র ও দলবল নিয়ে দিনদুপুরে অন্যের জায়গা দখলের চেষ্টা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় দুই বাসিন্দার বিরুদ্ধে। এমনকি রাতের আঁধারে ওই জায়গায় থাকা একটি টিনশেড ঘরে আগুনও দিয়েছে তারা। এ ঘটনায় মামলার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি হলেন—এসএম মনিরুল কদির ও এসএম সাইফুল কদির।
গত ২০ মার্চ বাকলিয়া সরকারি কলেজের পূর্বে সৌরভী আবাসিক এলাকার আলম বিল্ডিংয়ের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ২৮ মার্চ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরী বাদি হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, দখলের চেষ্টা করা জায়গায় প্রবেশ গেটে সেনাবাহিনীর লোগোযুক্ত একটি স্টিকার লাগানো। যেখানে লেখা রয়েছে, ‘সার্বিক নিরাপত্তার জন্য, সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ করবেন’। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা বলছেন, মনিরুল কদির ও সাইফুল কদিররাই স্টিকারটি লাগিয়ে দেন। এলাকার লোকজনকেও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন তারা।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মামলার বাদি জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও তার অপর দুই ভাই মো. নাছির উদ্দিন, নাজিম উদ্দিন চৌধুরী মিলে ২০০২ সালে ১১২০/১০ খতিয়ানের ২৯২১ দাগের, ৬ শতক জায়গা কিনেন। এরপর নামজারি খতিয়ান সৃজন করা হয়। পরে নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও নাজিম উদ্দিন চৌধুরী তাদের অংশ জামাল উদ্দিন চৌধুরীকে হেবা মূলে দলিল করে দেন। জায়গার উভয় পাশে ইটের বাউন্ডারি দিয়ে দখল এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে খোরশেদ নামের একজন কেয়ারটেকারও নিয়োগ দেন। সেখানে টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে তার থাকার ব্যবস্থাও করেন জামাল উদ্দিন।
জানা গেছে, ২০১২ সালে ওই জায়গার বন্ধক রেখে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে ২৫ লাখ টাকার ঋণও নেন জায়গার মালিক জামাল উদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু ২০ মার্চ বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এসএম মনিরুল কদির ও এসএম সাইফুল কদিরের নেতৃত্বে আরও ৪/৫ জন বাউন্ডারি ভেঙ্গে জায়গায় ঢুকে কেয়ারটেকার খোরশেদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজন। এসময় নিরাপত্তায় বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বাউন্ডারি ভাঙচুর করে। এতে অন্তত ৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি করে তারা।
এ বিষয়ে মামলার বাদি জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ২০০২ সালে ৬ শতক জায়গাটি কেনা পর ২০০৫ সালে নামজারি খতিয়ান সৃজন করি। পরে জায়গার চারপাশে ইটের বাউন্ডারি দিয়ে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খোরশেদ নামের একজনকে কেয়ারটেকার নিয়োগ দিই। তার থাকার জন্য সেখানে একটি টিনশেড ঘরও নির্মাণ করে দিই। এছাড়া ২০১২ সালে কৃষি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় ওই জায়গা বন্ধক রেখে ঋণও গ্রহণ করি। প্রতিপক্ষ ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে ২০১২ সালে মোমেনা বেগমের নামে একটি হেবা দলিল ও ২০১৩ সালে আরেকটি নামজারির মাধ্যমে আমার জায়গাটি দখলের পাঁয়তারা করছে।
তিনি বলেন, মনিরুল কদির ও সাইফুল কদিররা জায়গাটি তাদের দাবি করে আদালতে নিষেধাজ্ঞার জন্য অপর মামলাও করেছিল। ভূমি কর্মকর্তা তদন্ত করে দখল ও কাগজে-কলমে আমাকে জায়গার মালিক হিসেবে শনাক্ত করে প্রতিবেদন দিলে, আদালত তাদের মামলাটি খারিজ করে দেয়। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে, জায়গার বাউন্ডারি ভাঙচুর, কেয়ারটেকারকে মারধর এবং ঘরে আগুন দিয়েছে।
জামাল উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, মনিরুল কদিরদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করায় তারা আমাকে এবং কেয়ারটেকারকে হত্যাসহ নানান হুমকি দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে আমি এবং কেয়ারটেকারকে আসামি করে আদালতে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলাও করেছেন। সেখানে আমার করা মামলার সাক্ষী এবং জায়গা দখলের প্রতিবাদকারী লোকজনকেও আসামি করেছে।
সেলিম নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, জায়গাটিতে রাতে গর্ত করছে খবর পেয়ে সেখানে গেলে, ছয়টি গর্ত এবং আলাদা বাউন্ডারি দেওয়ার প্রস্তুতি দেখতে পাই। পরে জায়গার মালিক জামাল উদ্দিনকে ফোন করলে তিনি আসেন। এসময় প্রতিপক্ষের মাহবুবুল কদিরও সেখানে আসেন। তখন আমি তাদের বললাম, আপনারা দুইজনই আমার মামা। উভয়ে একটি বাসায় বসে, এটা সমাধান করেন। তখন মাহবুবুল কদির সোহেল বলেন, সেলিম তুমি কথা বলবা না, তুমি কার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছ জানো? এটি আমার মায়ের জায়গা। তখন আমি বললাম, আপনি ভুল করছেন। এটি আপনার জায়গা নয়, বাদল সাহেবের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। এটা অনেক বছর আগে থেকেই জানি। তিনি এখানে বাউন্ডারি দিয়েছেন। ব্যাংক থেকে এই জায়গার ওপর, ঋণও নিয়েছেন। ওয়ালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে দায়বদ্ধ লেখা আছে।
সেলিম আরও জানান, প্রথমে জায়গায় প্রবেশের সময় তিনি বাঁধা দিয়ে বলেন, এটা সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা। এখানে প্রবেশ করা যাবে না। তখন তিনি বলেন, সেনাবাহিনী হোক না হোক, আপনিতো আমার আঙ্কেল। পরে পাশের জমিদারের অনুমতি নিয়ে, জায়গা প্রবেশ করি। পাশের ভবনের মালিক হাঁটার পথে জায়গা দেওয়ায় জামাল উদ্দিনের সাথে ওনাকেও চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি করেছেন। তিনি কারও পক্ষ না নিয়ে, সত্য কথা বলায় তাকে মামলা দেওয়া হয়েছে।
সাইফুল আলম নামে এক প্রতিবেশী জানান, বিরোধীয় জায়গাটির অবস্থান তাদের বাড়ির পেছনে। ওই জায়গার মালিক জামাল উদ্দিন চৌধুরী। সেখানে কাজ করতে, বিভিন্ন মালামাল নিতে তাদের পথ ব্যবহার করতে দেওয়ায় তাকেও চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। জামাল উদ্দিন চৌধুরীর জায়গায় মালামাল নিতে পথ ব্যবহার করতে দিলে তাকে ফোন করে মামলা দেওয়া হবে বলে আগেই হুমকি দিয়েছিলেন প্রতিপক্ষ মাহবুবুল কদির।
সানি নামের এক যুবক বলেন, জামাল উদ্দিন চৌধুরী আমার মামা। প্রতিপক্ষ জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজ করে, জায়গাটি তাদের দাবি করছে। আমরা বাউন্ডারি দেওয়ার পর, কয়েকবার তারা হামলা করে ভেঙে দেয়। এসময় সিসি ক্যামেরাও ভেঙে দেয়। পুলিশ এবং এসিল্যান্ডের সামনে আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে, এলাকায় দুটি মসজিদ আছে এবং মজিদিয়া মাদ্রাসার মাঠ আছে। সেখানে কাগজপত্রে তাদের জায়গার প্রমাণ করতে পারলে, জায়গা ছেড়ে দেবো। এজন্য আলাদা ক্ষতিপূরণও দেব আমরা।
মামলা ও হামলার বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত এসএম সাইফুল কদিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটি আমি জানবো না। এটা আমার ছোট ভাই মেজর ডিল করেন। মামলা হোক, যাই হোক এটা আমার ছোট ভাই দেখবে। আপনি ওনার সাথে কথা বলেন।
একই বিষয়ে মামলার অপর আসামি এসএম মনিরুল কদিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, মামলার বাদির কাছে জানতে বলেন। এসময় তিনি উত্তেজিত হয়ে, প্রতিবেদককে আর ফোন না দিতে বলেন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে সাইফুলের ছোট ভাই মাহবুবুল কদিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপনার সাথে কথা বলতে হলে, আমার ডিজিএফআইয়ের অনুমতি লাগবে। আমি আর্মির অফিসার। অনুমতি নিয়ে আপনার সাথে কথা বলবো। আপনি আমার বাসায় আসেন। আমি বাসায়, আমার ইন্টাভিউ দিব। আপনি ক্যান্টনমেন্ট, আসেন।