লাগামছাড়া দুর্নীতি দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ঘিরে, খরচ বেড়েছে ১০ গুণ
ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইনে বৃষ্টি হলেই পাহাড়ধস
পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। এর মধ্যে চকরিয়ার হারবাং, চুনতি অভয়ারণ্য এলাকায় বারবার পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটায় প্রকল্পের নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকার এ প্রকল্পে পাহাড়ধস প্রতিরোধে পর্যাপ্ত গাইড ওয়াল না দেওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিধেষাজ্ঞার পর পাহাড় কেটে রেল নির্মাণ করায় এখন ঝুঁকিমুখে পড়েছে ট্রেন চলাচল। দু’দফা পাহাড়ধসে সাইড ওয়াল ভেঙে গেলে এবার শক্তিশালী গাইড ওয়াল নির্মাণকাজ শুরু করেছে রেলওয়ে।
এছাড়া এই প্রকল্পের কেনাকাটা নিয়েও ২৫টি অডিট আপত্তি উঠেছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র আটটি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের খরচও বেড়েছে ১০ গুণ। অবকাঠামো নির্মাণে যেসব মালামাল ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নমানের বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এসব অনিয়মের কারণ হিসেবে প্রকল্প পরিচালকের দিকেই আঙুল তুলছেন রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর পাহাড়ি ঢলে হারবাং এলাকায় রেললাইন তলিয়ে যায়। রেললাইন কাদামাটিতে ঢেকে যায়।
এর আগে গত ২২ আগস্ট দেশব্যাপী ভারী বৃষ্টি হলে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এরপর বেশ কয়েকদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পরে মাটি সরিয়ে ফের চালু করা হয় ট্রেন চলাচল।
এছাড়া ২০২৩ সালের আগস্টেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্মাণাধীন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের বিভিন্ন অংশ। সেবার টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া তেমুহনী এলাকায় পাথর ও মাটি সরে যাওয়ায় ৪৫০ মিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ না করেই সীমিত আকারে চালু হয় দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। মূলত নিয়ম না মেনে পাহাড় কাটা, রেললাইন নির্মাণ, পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় রিটেনিং দেওয়া নির্মাণ না করা, কালভার্ট-ব্রিজ নির্মাণ না করা, পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞার পরও পাহাড় কাটার কারণে এমন দুর্যোগ পোহাতে হচ্ছে।
ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। রেললাইনের কারণে লোগাহাড়ার চুনতি অভয়ারণ্যের আজিজনগর এলাকার প্রায় ৪০০ মিটার এলাকায় উভয় পাশে পাহাড়গুলোতে বেশি ধস হচ্ছে। আশপাশে সাইড ওয়াল দিলেও পাহাড়ের মাটির চাপে তা ভেঙে গেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় নতুন করে উঁচু সাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে রেলওয়ে। দু’দফায় পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষকেও দুর্ঘটনাস্থলে শক্তিশালী গাইড ওয়াল নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় (প্রায় ১০০ মিটার অংশ) তিন-চার ফুট উঁচু ওয়াল নির্মাণকাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট জানান, দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে নির্মাণ ত্রুটি, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে এমন ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
এছাড়া গাইড ওয়াল নির্মাণকাজের বিষয়ে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক বিমল সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সংযোগ বার বার কেটে দেন। এরপর ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি।
কেনাকাটায় ২৫ অডিট আপত্তি, খরচ বেড়ে ১০ গুণ
২০১০ সালের ৬ জুলাই দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় একনেক। তখন খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ও বিদেশি ঋণ ধরা হয়েছিল ৮১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তা বাস্তবায়নের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ডুয়েলগেজ লাইন করার জন্য সংশোধন করা হয়। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই অস্বাভাবিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সেই হিসেবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে ১০ গুণ। এক লাফে এত বেশি ব্যয় নিয়ে আপত্তি তুলে পরিকল্পনা কমিশন। এরপর রেলস্টেশন ও অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এসব কাজে যাবতীয় কেনাকাটার মধ্যে ২৫টি নিয়ে অডিট আপত্তি ওঠে। তবে এর আটটি নিষ্পত্তি হলেও বাকিগুলো আলোর মুখ দেখেনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করার শর্ত মানা হয়নি। প্রকল্পটিতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এক ধরনের অনিয়ম।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটায় ২৫টি অডিট আপত্তি উঠেছে। এর মধ্যে আটটি নিষ্পত্তি হয়, বাকি থাকে আরও ১৭টি।
দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা করে। এছাড়া প্রকল্পটির রামু-ঘুমধুম অংশের সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা আছে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা।
অভিযোগের তীর প্রকল্প পরিচালকের দিকে
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামের দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের হারবাং চকরিয়া, ডুলাহাজরা ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার—নয়টি স্থানে এ প্রকল্পের আওতায় স্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু নির্মাণাধীন রেলস্টেশন ও সার্ভিস এরিয়ার ভবনে লাগানো কাঠের দরজায় ফাটল ধরেছে। জানালার গ্রিল খুলে যাচ্ছে। টয়লেটের কমোড, বেসিন নিম্নমানের ব্যবহার করা হয়েছে।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণকাজ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ সবুক্তগীন। এসব নিম্নমানের সামগ্রী পরিবর্তন করতে আইএমডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে এক অনিয়মের মূলহোতা হিসেবে সবুক্তগীনের দিকেই অভিযোগের তীর সবার। এ প্রকল্পের সব কাজ তার তদারকিতেই হয়েছে। কোনো অনিয়ম হলে তার জন্য তিনিও দায়ী বলে জানিয়েছে রেলের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে আছেন মোহাম্মদ সুবক্তগীন। এসব বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি। মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
রেলের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) নাজমুল ইসলামের কাছে প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডিজে