চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনে রাষ্ট্রের অবাক ‘অনাপত্তি’, নেপথ্যে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল

বিনা বাধায় ৭ হত্যামামলায় জামিন

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ ও পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সাতটি হত্যা মামলায় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পথটি নীরবে নির্বিঘ্ন করে দিয়েছিল খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার কার্যালয়। গত ১৫ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, যেখানে ভয়ংকর এক আসামিকে মুক্ত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো স্থগিতাদেশ তো চাওয়া হয়নিই, উল্টো দেওয়া হয়েছিল ‘নীরব অনাপত্তি’। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা যৌক্তিকতা ছাড়াই দাপ্তরিক ফাইলে কেবল ‘না’ লিখে খুনের আসামিদের মুক্তির পথে থাকা সব আইনি বাধা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা আউটলুকে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন লিখেছেন জুলকারনাইন সায়ের।

দাপ্তরিক নথিতে দেখা যায়, প্রতিটি জামিন আদেশের বিপরীতে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ কোনো আইনি কারণ না দর্শিয়েই ‘অনাপত্তি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন।
দাপ্তরিক নথিতে দেখা যায়, প্রতিটি জামিন আদেশের বিপরীতে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ কোনো আইনি কারণ না দর্শিয়েই ‘অনাপত্তি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন।

রহস্যজনক অনাপত্তি ও নীরবতা

বাংলা আউটলুকের হাতে আসা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উচ্চ আদালত থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ও গত ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন একে একে সাতটি হত্যা মামলায় জামিন পান। পুলিশের নথি অনুযায়ী সাজ্জাদ চট্টগ্রামের বায়েজিদ, অক্সিজেন ও চান্দগাঁও এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। এমন একজন দুর্ধর্ষ আসামির জামিন ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষ সাধারণত আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করলেও এ ক্ষেত্রে ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রের কোনো প্রকার বিরোধিতা না থাকায় জামিন আদেশগুলো অত্যন্ত গোপনে ও নির্বিঘ্নে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পার হয়ে যায়।

ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা যৌক্তিকতা ছাড়াই দাপ্তরিক ফাইলে কেবল ‘না’ লিখে খুনের আসামিদের মুক্তির পথে থাকা সব আইনি বাধা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিলেন।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা যৌক্তিকতা ছাড়াই দাপ্তরিক ফাইলে কেবল ‘না’ লিখে খুনের আসামিদের মুক্তির পথে থাকা সব আইনি বাধা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলা আউটলুকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জামিন ঠেকাতে এই নীরব সম্মতির পেছনে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদ রউফ। নিয়মিত অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সে সময় দেশের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। দাপ্তরিক নথিতে দেখা যায়, প্রতিটি জামিন আদেশের বিপরীতে তিনি কোনো আইনি কারণ না দর্শিয়েই ‘অনাপত্তি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেই নিশ্চিত করা হয় যে, এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুক্তিতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই।

সন্ত্রাসের সাম্রাজ্য ও অপরাধনামা

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোট সাজ্জাদ বিদেশে পলাতক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’ এর প্রধান সহযোগী। চট্টগ্রামের চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং তৈরি পোশাক খাতের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। হত্যা, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রবাজির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ১৫ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স থেকে তাকে গ্রেফতার করা হলে পুলিশ একে একটি ‘বড় ধরনের সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। বর্তমানে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলাসহ মোট ১৯টি মামলা রয়েছে।

সাজ্জাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নারও সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। তামান্নার বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা। স্বামীর গ্রেফতারের পর আদালত ও জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন তামান্না। এরপর গত ১০ মে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

বর্তমানে সাজ্জাদ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং তার স্ত্রী তামান্না ফেনী জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চ আদালত তাদের দুজনকে যে সাতটি মামলায় জামিন দিয়েছিলেন, তার চারটি চান্দগাঁও থানার এবং তিনটি পাঁচলাইশ মডেল থানার। এই মামলাগুলো গত জুলাই মাসের আন্দোলন এবং চট্টগ্রামের অন্যান্য ভয়াবহ সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত।

গোপনীয়তা ও আইনি মারপ্যাঁচ

জামিন আদেশগুলো সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুতে সই হলেও গত ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা চট্টগ্রাম আদালত বা জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে এই জামিনের বিষয়টি স্থানীয় প্রসিকিউটর বা পুলিশের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।

নথি থেকে জানা যায়, শুরুতে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল উচ্চ আদালতে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেছিলেন। জামিন পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পর্যালোচনার জন্য নোট পাঠান। সাধারণত খুনের মামলার মতো গুরুতর বিষয়ে এই নোট পাঠানোর অর্থ হলো রাষ্ট্রপক্ষ উচ্চতর আদালতে এই জামিন স্থগিতের আবেদন করবে।

নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বাংলা আউটলুক জেনেছে, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে জামিন আদেশগুলো চ্যালেঞ্জ না করার তালিকায় রাখা হয়েছিল। মোহাম্মদ আরশাদ রউফের স্বাক্ষর সংবলিত প্রতিটি নথিতে ‘ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল’ এর সিলমোহরের পাশে হাতে লেখা ‘না’ শব্দটি ছিল, যার অর্থ হলো রাষ্ট্রপক্ষ স্থগিতাদেশ চাইবে না বা রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিনকে আর চ্যালেঞ্জ করবে না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের তালিকায় থাকা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর বেলায় এমন ঢালাও অনাপত্তি দেওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সাধারণত এ ধরনের গুরুতর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে থাকে।

টাকার বান্ডিল ও নাটকীয় মোড়

গত ৮ ডিসেম্বর যখন জামিননামা কারাগারে পৌঁছায়, তখন তামান্নার একটি পুরোনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তামান্নাকে দাবি করতে দেখা যায় যে, তিনি ‘বান্ডিল বান্ডিল টাকা খরচ করে’ তার স্বামীকে মুক্ত করে আনবেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তীব্র সমালোচনার মুখে রাষ্ট্রপক্ষ শেষ মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাতটি মামলার জামিনই স্থগিত করে দেন। ফলে সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর মুক্তি আপাতত আটকে যায়।

অস্পষ্ট ব্যাখ্যা, নিরুত্তর আরশাদ রউফ

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বাংলা আউটলুককে জানান, ভারপ্রাপ্ত থাকাকালীন মোহাম্মদ আরশাদ রউফ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রাখতেন। প্রসিকিউশন পক্ষ দুর্বল হলে বা এজাহারে নাম না থাকলে অনেক সময় আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চায় না, এমনটি বিবেচনা করেই হয়তো অনাপত্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই নির্দিষ্ট মামলার পেছনে কী কারণ ছিল, তা তিনি স্পষ্ট করতে পারেননি। বিষয়টি সামনে আসার পরই তারা স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেছেন।

পুরো বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ আরশাদ রউফের মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বাংলা আউটলুক তার কোনো সাড়া পায়নি। বিশেষ করে মো. আসাদুজ্জামান আসন্ন নির্বাচনে লড়তে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর আরশাদ রউফ পরবর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার দৌড়ে থাকায় এই ঘটনাটি আইনি অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।

সিপি

ksrm