চট্টগ্রামে হর্নের শব্দ তাণ্ডবে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা, স্কুলের পাশেই বিপজ্জনক মাত্রা

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার শিশুদের

চট্টগ্রাম নগরজুড়ে চলছে ভয়াবহ শব্দদূষণ। গাড়ির হর্নের শব্দ তাণ্ডবে অতিষ্ঠ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। এবার নগরীর এক স্কুলের সামনেই মিলেছে ৮৫ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৫ ডেসিবেল বেশি। শব্দদূষণে বেশি ক্ষতি হচ্ছে স্কুল শিক্ষার্থীদের। পড়াশোনায় ব্যাঘাতের পাশাপাশি কান ও নার্ভ দুর্বলসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে তারা।

বৃহস্পতিবার (৩০ মে) পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম গবেষণাগারের একটি দল চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গার কাটগড় মোড়ে শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করেছে। এতে দেখা গেছে, পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ৮৫ ডেসিবেল এবং পতেঙ্গা এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ৭৭ ডেসিবেল মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে।

জানা গেছে, বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্যসময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা হবে যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল।

নগরীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। এছাড়া নিয়ম না মেনে চট্টগ্রাম শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রায়ই রাত-দিন পাইলিংয়ের কাজ, ইট ভাঙার যন্ত্র, সিমেন্ট মিক্সারের ব্যবহার হচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় বলা আছে, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজের এসব যন্ত্র চালানো যাবে না।

এদিকে শব্দদূষণের সঙ্গে এই এলাকার আরেক যন্ত্রণা কাটগড় মোড়ের যানজট ও দ্রুতগতির গাড়ির চলাচল। ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিনই থাকে লোকাল সিটি বাসের জটলা। এছাড়া বিভিন্ন সময় ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যানও রাখা হয় রাস্তায়। এসব গাড়ির তীব্র হর্নের কারণে অতিষ্ঠ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাইড্রোলিক হর্নের শব্দদূষণে বিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষায় চরম ব্যাঘাত ঘটে।

অথচ বিদ্যালয়ের ৫০ গজের মধ্যেই রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ বক্স। কিন্তু এই মোড়ের গাড়ি নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা নেই বললেই চলে।

একইসঙ্গে ফুটপাতজুড়ে দখল, ভ্রাম্যমাণ হকার, ময়লার ভাগাড়, বড় বড় গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় স্কুল শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে ৬, ১০, ১১ ও ১৩ নম্বর লোকাল বাসগুলো যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় প্রায়ই পতেঙ্গা স্কুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।

পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও ওই এলাকায় পতেঙ্গা বোর্ড স্কুল, পতেঙ্গা সী ভিউ স্কুল, ইস্টার্ন রিফাইনারি স্কুল, পতেঙ্গা কেজি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লার্নিং বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও পতেঙ্গা ইসলামিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। কাটগড় মোড় থেকে এসব স্কুলের দূরত্ব প্রায় আধ কিলোমিটার। প্রতিদিনই এসব স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের গাড়ির অসহ্য হর্ন শুনেই যাতায়াত করতে হয়।

সরেজমিন কাটগড় মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, পতেঙ্গা স্কুলের সামনে বিভিন্ন রুটের লোকাল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এতে রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে। আবার অনেক জায়গায় সিএনজি অটোরিকশা ও রাইডশেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া কয়েকটি কাভার্ডভ্যান ও লরি স্কুলের একটু সামনে গিয়ে পার্কিং করেছে। এসব বড় গাড়ি পার্কিং করায় যানজট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে স্কুলের টিফিন ছুটি হলে ছাত্রছাত্রীরা খাবার খাওয়ার জন্য ব্যস্ত রাস্তা ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে।

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, কাটগড় মোড়ের ফুটপাত ও সড়কে দোকান বসিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা করছে বেশ কয়েকজন হকার। সড়কের একপাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ রাখা হয়েছে। এছাড়া সড়কের দু’পাশে ইজিবাইক (টমটম) দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে আরও ভোগান্তি তৈরি করেছে। এসব এলাকায় রাস্তা পারাপারে নেই কোনো জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ। বড় বড় গাড়ির গতি কমাতে বসানো হয়নি কোনো গতিরোধক।

পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো. জাবেদ বলেন, ‘আমাদের স্কুল গেটের সামনে সকাল থেকে বিভিন্ন গাড়ি দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী ওঠানামা করায়। গাড়ির শব্দের কারণে অস্থির লাগে। অনেক সাবধানে রাস্তা পারাপার হতে হয় আমাদের। আমরা চাই, নিরিবিলি ও শান্তি মতো ক্লাস করতে।’

পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী শ্রেয়া দেব বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ও স্কুল ছুটির পর একা একা রাস্তা পার হতে গিয়ে বড় বড় গাড়ি দেখে খুব ভয় লাগে। বিভিন্ন গাড়ির লাগাতার শব্দের কারণে মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা করে।’

চম্পা জলদাস নামের এক ছাত্রের অভিভাবক বলেন, ‘পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার দুই সন্তান লেখাপড়া করে, ছেলে সুবর্ণ নবম শ্রেণীতে ও মেয়ে স্নিগ্ধা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। তারা প্রায় সময় স্কুল থেকে বাসায় ফিরে বলে, মাথা ব্যথা করছে। আবার কখনো বলে, কানে ব্যথা করছে। আসলে এগুলো কি কারণে হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

কেইপিজেডে কর্মরত গার্মেন্টসকর্মী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘সকালে টমটম করে কাটগড় মোড়ে আসি, টমটমে নানা কর্মজীবি মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও থাকে। টমটম চালকদের তাড়াহুড়ো আর যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতার কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই সড়কে গাড়ির শব্দের কান ঝালাপালা হয়ে যায়।’

পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘পতেঙ্গা আলোড়ন’র সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বলেন, ‘কাটগড় মোড়ে পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়সহ আশপাশে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে স্কুলের সামনে উচ্চ হর্নের কারণে শব্দদূষণে নানা রোগে আক্রন্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ পথচারীরা। অথচ কাটগড় মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের বক্স থাকলেও পুলিশ নিজেরাই গাড়ি থামিয়ে গাড়িপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা চাঁদা নিচ্ছে।’

পতেঙ্গা নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদ হাসান বলেন, ‘বিভিন্ন গাড়ির উচ্চ হর্নের কারণে পতেঙ্গা উচ্চ বিদয়ালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সড়ক পারাপার সব শ্রেণীর মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পতেঙ্গা স্কুলের সামনের কাটগড় মোড় কয়েকটি সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় যানযট লেগেই থাকে। বিশেষ করে বাস ও সিএনজি স্টেশনের কারণে মূলত এ যানযট।’

পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী আহমদ বলেন, ‘পতেঙ্গা স্কুলের সামনে বিভিন্ন যানবাহন অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে তুলেছে। সকাল থেকে স্কুল চলাকালীন সময়ে এসব যানবাহনের হর্নের কারণে শিক্ষার্থীরা ঠিক মত ক্লাস করতে পারে না। আমাদের শিক্ষকদেরও ক্লাস নিতে সমস্যা হয়। ট্রাফিক বিভাগকে একাধিকবার জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাইনি। আমাদের এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকই রাস্তা পার হয়ে স্কুলে আসে। আমরা প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিন্তায় থাকি।’

এ বিষয়ে ৪০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল বারেক বলেন, ‘বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের জন্য কেইপিজেড এবং কাটগড় মোড়ে দুটি ফুটওভার ব্রিজ করা হবে। ফুটওভার ব্রিজের জন্য দুই কোটি টাকার টেন্ডার পাস হয়েছে।’

পতেঙ্গার নেভী হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. নেসার উদ্দিন বলেন, ‘শব্দদূষণের কারণে শিশুদের মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, আচরণে অস্বাভাবিকতা, লেখাপড়ায় অমনোযোগী ও স্মরণশক্তি কমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত, কানে কম শোনা, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ নার্ভগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাওয়াসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

সিএমপি উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক বন্দর) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ, গতিরোধক বসানো মূলত সড়ক ও জনপদ, সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের কাজ। আমাদের কাজ হচ্ছে, যানজট নিরসন করা। এনিয়ে আমি সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশন সঙ্গে একাধিক বার কথা বলেছি। আমিও কয়েকবার পরিদর্শনে গিয়ে গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কাটগড় ট্রাফিক বক্স ও স্কুলের মাঝখানে গাড়িগুলো ইউটার্ন করার সময় জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। তাহলে যানজট থাকবে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম গবেষণাগারের পরিচালক নাসিম ফারহানা শিরীন বলেন, ‘ইতোমধ্যে গবেষণাগারের টিম পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করেছে। পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ৮৫ ডেসিবেল এবং পতেঙ্গা এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ৭৭ ডেসিবেল মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে।’

শীঘ্রই শব্দদূষণে রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা বলেন নাসিম ফারহানা শিরীন।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!