চট্টগ্রামের জামালখানে চট্টগ্রামের বীর সন্তানদের নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয় নামফলক ‘চট্টল গৌরব’। যে ফলকগুলোতে খ্যাতিমান ৩১ জন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম ঠাঁই পায়। তবে উদ্বোধনের পরপরই এই নামফলক নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াও রাজনৈতিক অঙ্গনে। চট্টল গৌরবে ঠাঁই পাওয়া অনেকেই চট্টগ্রামের সন্তান নন বা কেউ কেউ কখনও চট্টগ্রামেই পা রাখেননি। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে চট্টল গৌরব জহুর আহমেদ চৌধুরী ও এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ব্যক্তিত্বকে বাদ দেওয়ার ঘটনায়।
এ নিয়ে চট্টগ্রাম প্রতিদিনে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। ৩১ ‘চট্টল গৌরবের’ তালিকায়ও জহুর আহমেদ চৌধুরী ও এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর ঠাঁই হল না কিভাবে— এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন অনেকেই। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার (৩০ ডিসেম্বর) মহসিন কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা এগিয়ে এসে মহসিন স্কুলের দেয়ালে নির্মিত সেই ‘চট্টলগৌরবে’ টাঙ্গালেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর ছবি। মূল উদ্যোগ নেন মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম ইউ সোহেল ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগ নেতা হাসমত খান আতিফ।
মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম ইউ সোহেল চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন যে চট্টলগৌরবের ফলক তৈরি করেছেন তা অবশ্যই সুন্দর কাজ। কিন্তু তিনি হয়ত ভুলে গেছেন মহিউদ্দীন চৌধুরী ছাড়া চট্টগ্রাম কখনও পরিপূর্ণ হতে পারে না। ফলক নিয়ে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর অনেকেই ওনাকে ফলকটিতে মহিউদ্দীন চৌধুরীর ছবি বসানোর অনুরোধ করলেও তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। তাই আমরা নিজেরাই সেই অপরিপূর্ণ চট্টলগৌরবকে পরিপূর্ণ করতে মহিউদ্দীন চৌধুরীর ছবি টাঙ্গিয়েছি।’
চট্টলগৌরব ফলকটি উদ্বোধনের পর গত ১৯ ডিসেম্বর ‘জহুর-মহিউদ্দীন চৌধুরীর ঠাঁই হল না ৩১ চট্টল গৌরবের তালিকায়’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম প্রতিদিনে। এরপরই জামালখানের ফলক নিয়ে ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
তখন ক্ষোভ জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সৈনিক ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জহুর আহমদ চৌধুরীর নাম চট্টলগৌরবের তালিকায় নেই। চট্টগ্রামকে সারা বিশ্বে পরিচিত করিয়েছেন যিনি, সেই এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর নাম নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী বরেণ্য রাজনীতিবিদ মৌলভী সৈয়দও নেই। এ ধরনের ব্যক্তিত্বকে বাদ দিয়ে বরেণ্য ব্যক্তির তালিকা কিভাবে হয়? শত বছরের রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এদের বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চট্টগ্রামের এরা ভূমিপুত্র। অথচ চট্টগ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন কেউ কেউও ম্যুরালে স্থান পেয়েছেন।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য আরও বলেন, ‘যারা এই কাজটা করেছেন, তারা যেন আবার চিন্তা করে ঢেলে সাজায়— এই প্রত্যাশা থাকবে আমার।’
গত ১৬ ডিসেম্বর অনেকটা তড়িঘড়ি করেই চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসীন হাই স্কুলের দেয়ালে নবনির্মিত ম্যুরালের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটির মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন।
জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন জানান, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, প্রফেসর ড. অনুপম সেন, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এবং কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেনের সমন্বয়ে একটি জুরি বোর্ড ১০০ জন মনীষী থেকে ৪০ জনকে বাছাই করেন। পরে শিল্পী প্রণব কুমার সরকার এ ম্যুরালগুলো নির্মাণ করেন। সেখান থেকে ৩১ জনকে নিয়ে ‘চট্টল গৌরব’ শিরোনামে ম্যূরাল উন্মোচিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ফোর-এইচ গ্রুপ।
তবে ৩১ জনের তালিকাতেও মহিউদ্দীন চৌধুরীর নাম না থাকার ক্ষেত্রে নিজের কোনো দায় নেই জানিয়ে শৈবাল দাশ সুমন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি শুধু উদ্যোগটা নিয়েছি আর বাস্তবায়ন করেছি। এখানে কার ছবি থাকবে কার ছবি থাকবে না এখানে আসলে আমার কোনো ভূমিকা নাই। আমাদের শহরের চারজন গুণি ব্যক্তি এই তালিকাটা করেছেন।’
সেই ম্যুরালে যে ৩১ জনের ম্যুরাল উন্মোচিত হয় তারা হলেন— দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসিন, মুহম্মদ এনামুল হক, আবুল কাশেম খান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোজাফফর আহমদ, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, কাজেম আলী মাস্টার, মাহবুব উল আলম, কল্পনা দত্ত, মাহাবুব উল আলম চৌধুরী, শেখ রফিউদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, শরৎ চন্দ্র দাস, বুলবুল চৌধুরী, চাকমা রাণী কালীন্দী, লোকনাথ বল, বেনীমাধব বড়ুয়া, আব্দুল হক দোভাষ, এম এ আজিজ, নবীনচন্দ্র সেন, অমলেন্দু বিশ্বাস, এম এ হান্নান, কবিয়াল রমেশ শীল, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, রজব আলী খান, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, নবীন চন্দ্র সেন, কবি আব্দুল হাকিম, আবদুল করিম, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, অধ্যাপক আবুল ফজল ও যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত।
বিএস/সিপি
চট্টগ্রামের জন্য অনেক করেও যার নাম আসেনি তিনি ফজলুল কাদের চৌধুরী।
কোন দোহাই দিয়ে তার অবদান কে অস্বীকার/ছোটো করা যাবে না, যদি আপনি অরিজিনাল চট্টগ্রাম প্রেমী হয়ে থাকেন।