লন্ডনের ‘ছায়া ব্যাংক’ ধসের পর জাবেদের সম্পদ সাম্রাজ্যে নতুন ঝড়, কাঁপছে ওয়াল স্ট্রিট

১৪ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি

লন্ডনের অভিজাত এলাকা মেফেয়ারে গড়ে ওঠা একটি ‘শ্যাডো ব্যাংক’-এর নাটকীয় পতনে বিশ্ব অর্থনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ৯৩০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ১৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ঘাটতি নিয়ে ধসে পড়া এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিস্তৃত সম্পদ সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ছিল। এই তথ্য সামনে আসার পর সিটি অব লন্ডন থেকে ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত আর্থিক অঙ্গনে আলোড়ন তৈরি হয়। জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সল্যুশনস বা এমএফএস-এর পতনের প্রভাব পড়েছে বিশ্বসেরা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন লিখেছেন টম স্যান্ডার্স।

জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসকের অধীনে চলে গেছে ৫৮ বছর বয়সী পরেশ রাজার ‘ছায়া ব্যাংক’ এমএফএস। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ।
জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসকের অধীনে চলে গেছে ৫৮ বছর বয়সী পরেশ রাজার ‘ছায়া ব্যাংক’ এমএফএস। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ।

গডফাদার যখন আইডল

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়ান ভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমএফএসের প্রতিষ্ঠাতা পরেশ রাজা তার আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ওয়াল স্ট্রিট ছবির চরিত্র গর্ডন গেকো এবং দ্য গডফাদারের ডন ভিটো কর্লিওনের নাম। ২০২৩ সালে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাদের কাজের ধরন বা উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, তাঁদেরই তিনি আইডল মনে করেন। তবে নিজের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসকের অধীনে চলে যাওয়ায় ৫৮ বছর বয়সী পরেশ রাজা এখন সেই মন্তব্যের জন্য অনুতপ্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্লুমবার্গেরর দেখা আদালতের নথি অনুযায়ী, এমএফএসের ব্যালেন্স শিটে ৯৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি বড় ‘ব্ল্যাক হোল’ তৈরি হয়েছে।

ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি বা এনসিএ বর্তমানে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করছে। ছবি: আল জাজিরা।
ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি বা এনসিএ বর্তমানে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করছে। ছবি: আল জাজিরা।

মন্ত্রীত্বের সময়েই বাড়ে জাবেদের সম্পদ

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগে টানা পাঁচ বছর ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ যুক্তরাজ্যজুড়ে বিশাল আবাসন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এমএফএস ছিল জাবেদ ও তার পরিবারের বিতর্কিত প্রপার্টি ডিলগুলোর অন্যতম প্রধান অর্থদাতা। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পর জাবেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এমএফএসের মাধ্যমে শত শত ঋণ নেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতনের পর এমএফএসসংক্রান্ত প্রায় সব ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাবেদের সাম্রাজ্যে অর্থায়ন

ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি বা এনসিএ বর্তমানে জাবেদের বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করছে। গত বছরের জুনে সংস্থাটি তার ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা মূল্যের ব্রিটিশ সম্পদ জব্দ করে। তবে পরেশ রাজা বা এমএফএসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আইনি অভিযোগ আনেনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। সে সময় পরেশ রাজার আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন, এমএফএসে বড় আন্ডাররাইটিং দল রয়েছে, যারা প্রতিটি ঋণ যাচাই করে এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিস্তারিত পরীক্ষা চালায়। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে এও দাবি করেছিলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে পরেশ রাজার কোনো সম্পর্ক নেই।

ঋণের জাল ও উত্থানের গল্প

২০০৬ সালে পরেশ রাজা ও তাঁর স্ত্রী তিবা রাজা এমএফএস প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথাগত ব্যাংকের মতো আমানত গ্রহণ না করায় এই ছায়া ব্যাংককে কঠোর ব্যাংকিং নীতিমালা মানতে হতো না। তারা মূলত এমন বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিত, যারা মূলধারার ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ব্যর্থ হতেন। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বলা হয়, মূলধারার ব্যাংকের উপযুক্ত নন—এমন গ্রাহকদের সহায়তা করাই তাদের লক্ষ্য। এশিয়ান ভয়েসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরেশ রাজা বলেন, বিদেশি বাসিন্দা বা অতীতে কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়া গ্রাহকদেরও তারা সহায়তা করেন।

ধসের আগে পর্যন্ত এমএফএস দ্রুত প্রবৃদ্ধির দাবি করে আসছিল। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তারা ১ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত পুঁজি সংগ্রহের কথা জানায় এবং ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড। পতনের মাত্র ১১ মাস আগে পরেশ রাজা এক বছরের মধ্যে ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ডে উন্নীত করার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। ক্রীড়াপ্রেমী এই উদ্যোক্তা ফুটবল, ক্রিকেট, ফর্মুলা ওয়ান ও টেনিস দেখতে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করতেন এবং নিয়মিত অর্থনীতিবিষয়ক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতেন।

গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, এমএফএসের সহযোগী সংস্থা আম্বার ব্রিজিং ও জিরকন ব্রিজিং আর্থিক হিসাবে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলে। এর পর চলতি সপ্তাহে অ্যালিক্সপার্টনার্স থেকে দেউলিয়া বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই সম্পদ ব্যবহার করে একাধিক ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড ঋণের ৮০ শতাংশই ঘাটতির মুখে।

বিচারপতি ব্রিগস অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুতর বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, প্রশাসক নিয়োগের আদেশ মানতে ব্যর্থ হওয়ায় পাওনাদারদের সম্পদ সুরক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। তবে প্রশাসক নিয়োগের সময় পরেশ রাজা দাবি করেন, এটি ব্যবসার ব্যর্থতা নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও পদ্ধতিগত অচলাবস্থা, যা সাময়িকভাবে তাদের ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত করেছে।

বিশ্ববাজারে ধাক্কা

এদিকে পরেশ রাজার প্রতিষ্ঠান এমএফএস-এর এই পতনের ফলে সান্তান্দার, ওয়েলস ফারগো, জেফারিজ এবং বার্কলেসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যাংকগুলো বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এমএফএস-এর সঙ্গে বার্কলেসের প্রায় ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ডের (প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা) লেনদেন ছিল, যা কিছুদিন আগে তারা স্থগিত করে দিয়েছে। মার্কিন ব্যাংক জেফারিজের ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) এই সংকটের মুখে আটকে আছে।

এই খবরের পর আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে জেফারিজের শেয়ার ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, বার্কলেসের শেয়ার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অ্যাপোলোর শেয়ার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। তবে সিটি গ্রুপের মতে, বার্কলেসের লোকসান প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিএমও মার্কেটস জানিয়েছে, জেফারিজের অনেক ঋণ সরাসরি এমএফএস-এর মাধ্যমে হয়নি। এই ঘটনাটি গত বছর ধসে পড়া মার্কিন অটো লেন্ডার ট্রাই কালার হোল্ডিংস এবং অটো পার্টস সরবরাহকারী ফার্স্ট ব্র্যান্ডস গ্রুপের পতনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। জেপি মরগানের প্রধান জেমি ডিমন বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দার আগের সময়ের ‘তেলাপোকা’দের সঙ্গে তুলনা করে সতর্ক করে দিয়েছেন।

তদন্তের জালে রাজনীতি

বাংলাদেশেও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ নিয়ে তদন্ত চলছে। এই দুর্নীতির আঁচ লেগেছে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও। গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রেজারি মন্ত্রীর পদ ছাড়েন শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক। বাংলাদেশে নিজের খালার সরকারের কাছ থেকে অবৈধভাবে জমি নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এমএফএসের পতন নিয়ে টেলিগ্রাফ পরেশ রাজার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি।

ksrm