সহমর্মিতা ও সমবেদনা, আত্মশুদ্ধি ও সাম্যের মাস রমজান

মানবসভ্যতার বহুবর্ণ বাস্তবতায় একদিকে যেমন প্রাচুর্য আছে, অন্যদিকে রয়েছে দারিদ্র্য, অনাহার ও অসহায়তার দীর্ঘ ছায়া। পৃথিবীর কোনো সমাজেই এমন মানুষ নেই, যারা বঞ্চনা, অভাব বা কষ্টে নিমজ্জিত নয়। ইসলামের শিক্ষা এই বৈষম্যময় বাস্তবতার মাঝেই মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। সৃষ্টিজগতের অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে বিবেচিত। এই মর্যাদা মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে আরও বিস্তৃত করে। সমাজে অতিপীড়িত, অসহায়, অভাবগ্রস্ত, ক্ষুধার্ত ও দুস্থ মানুষের দুঃখ লাঘব করা এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া তাই মানুষের পারস্পরিক দায়িত্বের অংশ।

ইসলামি শিক্ষায় এ মূল্যবোধের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি তোমরা দয়া করো, তাহলে আকাশে অধিষ্ঠিত প্রভুও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ পবিত্রতা, বদান্যতা, সহমর্মিতা ও সহানুভূতির এই শিক্ষা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় মাহে রমজানে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে এ মাস মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিত্তবানদের দয়া, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা জাগ্রত হয়। এ কারণেই হাদিস শরিফে রসুল (সা.) রমজানকে ‘শাহরুল মুওয়াসাত’ বা সহমর্মিতা ও সহানুভূতির মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রোজা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি সামাজিক সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। সমাজজীবনে ধনী-গরিব সবাই রোজার মাসে ইবাদতের মাধ্যমে একত্রে সমাজবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেন। প্রকৃত রোজাদার কাউকে ঠকাতে বা প্রতারণা করতে পারেন না। বরং সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, দুর্বল, পীড়িত, অসুস্থ, অনাথ, ছিন্নমূল ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের খাওয়া-পরা নিশ্চিত করা, সেহ্‌রি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা এবং সাধ্য অনুযায়ী পরোপকারে ব্যস্ত থাকা রোজাদারের দায়িত্বের অংশ হয়ে ওঠে। এভাবে ত্যাগ-তিতিক্ষার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে রোজাদাররা ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হন।

দারিদ্র্যের অনুভূতি ও মানবিক দায়িত্ব

রমজান সামাজিক ঐক্য ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ধনী-গরিবের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহানুভূতির সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রোজার ভূমিকা অপরিসীম। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার ফলে রোজাদাররা ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা ধনী মানুষের কাছে দরিদ্র ও বুভুক্ষু মানুষের দুঃখ-কষ্টকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ফলে তারা সহজেই অসহায় গরিব, এতিম ও নিরন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন এবং তাদের জন্য সেহ্‌রি ও ইফতারের ব্যবস্থা করেন, জাকাত-সাদকা ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়ান।

নবী করিম (সা.) এ মাসকে যথার্থই সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রোজা মানুষের মধ্যে সম-অধিকারের বোধ জাগিয়ে তোলে এবং সমাজের গরিব মানুষের প্রতি সদয় আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। রোজাদার ব্যক্তি কারও প্রতি অসদাচরণ বা অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত থাকেন। সবাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সাম্যের চেতনা ধারণ করেন। সমাজের শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ যাতে যথাযথভাবে রোজা পালন করতে পারেন, সে জন্য ধনী ও সামর্থ্যবানদের সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথাও ইসলামে বলা হয়েছে।

শ্রমিক ও অধীনস্থদের প্রতি সদয় আচরণ

রমজান মাসে মালিকদের জন্যও রয়েছে মানবিক দায়িত্বের শিক্ষা। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, অগ্রিম বেতন-ভাতা প্রদান এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা উচিত। অধীনস্থ শ্রমিক, কর্মচারী ও চাকরবাকরদের দায়িত্ব ও কাজ হালকা করে দেওয়া মানবিকতার দাবি। কারণ তারাও রোজাদার। কঠিন ও সাধ্যাতীত কাজের চাপ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত।

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানে যারা দাস-দাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে এবং তাদের কাজের বোঝা হালকা করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন।’ এই শিক্ষা রমজানকে শুধু ইবাদতের মাস নয়, মানবিকতারও মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সংযম, শান্তি ও সামাজিক স্থিতি

রমজান আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। রোজাদাররা এ মাসে অপরের বদনাম, কুটনামি, ঝগড়া-বিবাদ ও ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন। অযথা বাগ্‌বিতণ্ডা বা অশ্লীল কথাবার্তা পরিহার করা রোজার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নবী করিম (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রোজা রাখে তখন তার মুখ থেকে যেন কোনো খারাপ কথা বা শোরগোল বের না হয়। যদি কেউ তাকে গালিগালাজ করে বা ঝগড়ায় প্ররোচিত করে, তখন সে যেন বলে আমি রোজাদার ব্যক্তি।’

এই আত্মসংযম সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক। রোজাদাররা যদি উত্তেজিত না হয়ে বিরোধ এড়িয়ে চলেন, তবে সমাজে অস্থিরতা কমে এবং সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়। ফলে একটি নৈতিকতাপূর্ণ ও সংঘাতমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দান, সহমর্মিতা ও আল্লাহর নৈকট্য

রমজান সমাজে স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে। মাসব্যাপী রোজা পালনের মাধ্যমে ধনী মানুষ গরিবের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করেন এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। ইসলামি বিধানে ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ এবং ফিতরা ওয়াজিব করা হয়েছে, যাতে গরিব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা যায়।

জাকাত, ফিতরা, সাদাকাহ ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে মানুষ অধিক সওয়াব লাভের সুযোগ পায়। ইসলামে প্রতিটি নেক কাজের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধির ঘোষণা রয়েছে। মাহে রমজানের মর্যাদার কারণে এ মাসে প্রতিটি সাধারণ নেক কাজ একটি ফরজের সমতুল্য এবং প্রতিটি ফরজ ইবাদত ৭০টি ফরজের সমান গুরুত্ব লাভ করে। ফলে মুমিন মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এ মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত করেন।

এতে একদিকে মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়, অন্যদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম হয়। রমজান তাই শুধু ইবাদতের সময় নয়, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বোধেরও শিক্ষা দেয়। মহান রব্বুল আলামিন যেন আমাদের সব অসহায়, বিপন্ন ও দুর্গত মানুষের সাহায্যে সহানুভূতিশীল হওয়ার এবং তাদের দুর্দশা লাঘবে সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করার তৌফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm