শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সরকারি বরাদ্দের বাসা দখলে মরিয়া, নেপথ্যে গণপূর্তের প্রকৌশলী

দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে, মা-বোনের ইজ্জত বাঁচাতে, মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে গেছে শহীদ মো. রফিক। অথচ দেশের জন্য আত্মদানকারী সেই শহীদের স্ত্রী-কন্যারা এবার শিকার হচ্ছেন সন্ত্রাসী তাণ্ডবের। সন্ত্রাসী লেলিয়ে তাদের সরকারের দেওয়া ঘর দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে খোদ গণপূর্ত অধিদপ্তর চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সিএমপির খুলশী থানা পুলিশ বিরুদ্ধেও উঠেছে অসহযোগিতার চরম অভিযোগ৷ থানার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না তারা। আইনি সহযোগিতা চাইলেও পাত্তাই দিচ্ছেন না খোদ খুলশী থানার ওসি।

যিনি দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেলেন, তার স্ত্রী-কন্যারা সরকারি কর্তা ও সন্ত্রাসীদের অপকর্মে শিকার হওয়াকে খুবই লজ্জাজনক মনে করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এনিয়ে থাকছে টিম চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধান।

শহীদ মোহাম্মদ রফিক। ১৯৭১ সালে ছিলেন টগবগে যুবক। বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার, কধুরখীল গ্রামের সর্দার পাড়া এলাকায়।

১৯৭১ সালে, যুবক মোহাম্মদ রফিক, নিজের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে, ঘরে রেখে দেশের ক্রান্তিকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ দিন আগে, ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন—এই বীর।

রেখে যান, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে। সঙ্গে দেড় বছরের আদরের কন্যা নাছিমা আক্তারকেও। পরে স্বাধীন বাংলায় জন্ম নেন, আরেক কন্যা সন্তান—নাম ইয়াছমিন আক্তার। নাছিমা বাবার কিছু আদর, কিছু ভালোবাসা পেলেও দ্বিতীয় কন্যা ইয়াসমিন কিছুই পাননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীকে হারিয়ে দুই কন্যা নিয়ে রিজিয়া বেগমের জীবন ছিল সংগ্রামের।

শহীদের স্ত্রীর মর্যাদা পেলেও দুই কন্যাকে নিয়ে থাকার কোনো ঘর ছিল না রিজিয়ার। এই দুই কন্যাকে নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতায় জীবন কাটান এই হতভাগা নারী।
১৯৮২ সালের ৩০ জুন। শহীদপত্নী রিজিয়া বেগম ও তার কন্যাদের বসবাসের বাড়ি দেওয়ার সুপারিশ করে কর্ম মন্ত্রণালয়। সুপারিশের এক দশক পর চট্টগ্রামের খুলশী থানার পূর্ব নাছিরাবাদ এলাকায় একটি পরিত্যাক্ত বাড়িতে ঠাঁই হয় তাদের।

১৯৯২ সাল থেকে দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে রিজিয়ার উঠেন খুলশী থানার জাকির হোসেন রোডের একটি সরকারি বরাদ্দের বাড়িতে। এই বাড়িতেই ছেলে সন্তানহীন এই নারীর জীবন কেটেছে একে একে ৩২ বছর।

মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিধবা হয় রিজিয়া বেগম। স্বামীর আত্মত্যাগের প্রতিদানে পাওয়া এ বাড়িতেই তিনি ত্যাগ করতে চান শেষ নিঃশ্বাসটুকু।

শহীদ পরিবারের মাথাগোঁজার ঠাঁই হওয়া বাড়িটি এখন সন্ত্রাসীদের কুনজর। এটি দখল নিতে ভূমিদস্যুদের সঙ্গে একাট্টা গণপূর্ত অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলীর। টিম চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধান এবার গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওই নির্বাহী প্রকৌশলী আর ভূমিদস্যু সেলিমের ওপর। তথ্যের খোঁজে। শুধুই তথ্যের খোঁজ নয়। বের করে আনতে চায়, প্রকৃত কারণও।

এই শহীদ পরিবার বলছে, সরকারি বরাদ্দের এই বাড়িটি দখলের মূল পরিকল্পনাকারী গণপূর্ত অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম। মূলতই তিনি এটি দখলে ভাড়াটে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়েছে এই পরিবারের ওপর। এই শহীদ পরিবারে নেই কোনো ছেলেসন্তান। সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের সঙ্গে একাই লড়ছেন হতভাগা নারী।

একে একে ৩২ বছর ধরে বসবাসের বাড়িটি দখল, আর শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদে পাঁয়তারা অভিযোগ তুলেছেন খোদ শহীদ রফিক স্ত্রী ও কন্যারা।

এই শহীদ নাছিমা আক্তার টিম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, রাতে আঁধারে আর দিনের আলোতে সমানতালেই চলছে ভয়ভীতি দেখানো ও উচ্ছেদের চক্রান্ত। টানা হুমকি আর মোবাইল ফোনে একের একের তলবের হুমকিতে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সপরিবারে। মুঠোফোনের রিং টোন বেজে উঠলেই এখন আঁতকে উঠছেন এই শহীদ পরিবারের স্ত্রী, কণ্যা ও নাতি নাতনীরা।

অথচ—যুদ্ধ পরবর্তীতে, শহীদ রফিকের স্ত্রী রিজিয়া বেগম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে ১০০ টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতেন। এই ভাতা চলমান এখনও। শহীদ পত্নীর ভয় এখন বসবাসের বাড়িটি হারানো আর বেদখলের। স্বামীর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া বাড়িটি ছাড়তে চান না রিজিয়া বেগম। বাকি জীবন কাটাতে চান তিনি এ বাড়িতেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন শহীদ পত্নী রিজিয়া।

গণপূর্ত অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈনুল ইসলামের যোগসাজশে, ২৯ এপ্রিল রাত ১০টায় হঠাৎ ক্রেন ও পেট্রোল নিয়ে সন্ত্রাসীরা দলবল নিয়ে আসে শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদ করতে। এদের মধ্যে যাদের নাম উঠে এসেছে, ভয়ঙ্কর মশিউর রহমান দিদার ও সেলিমের। মূলতই রাতের আঁধারে উচ্ছেদ চক্রান্তের আরেক হোতা হিসেবে দেখছেন তারা সেলিমকে। সেলিম নাসিরাবাদ ইউনিট আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যুক্ত থাকার কথা শোনা গেছে। তবে আওয়ামী লীগের কেউই এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। সেলিম মূলতই মশিউর রহমান দিদারের হয়ে দখল বেদখলসহ নানা অপকর্মে জড়িত।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কেউ না হয়েও কিভাবে শহীদ পরিবারকে কেন উচ্ছেদ চেষ্টা চালাচ্ছেন, জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় সেলিমের সঙ্গে। এ সময় মুঠোফোনের অপর প্রান্ত থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, সেলিম বাইরে গেছে। এরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।পরে তার আর সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে খুলশীর বাড়িটি একনেকের প্রকল্পভুক্ত সংরক্ষিত বাড়ি জানিয়ে চট্টগ্রামের গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম বলেন, বিকল্প বাড়ি হিসেবে তাদেরকে নগরের লালখান বাজার সামসী কলোনিতে একটি বাড়ি দেওয়া হয়েছে। তারা সেই বাড়িতে না গিয়ে খুলশীর এ বাড়িটি জোর করে দখলে রেখেছে।

অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ রফিকের পরিবারের জন্য লালখানবাজার এলাকায় যে বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানান গণপূর্তের কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম, তাতে বসবাস করছে আরেক শহীদ পরিবার। তাদের নামেই রয়েছে বরাদ্দের ছাড়পত্র। এছাড়া রয়েছে উচ্চ আদালতের স্টে অর্ডারও। বিষয়টি স্বীকার করে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম জানান, শহীদ রফিকের পরিবার লালখানবাজার এলাকার বাসায় না যাওয়ায় কিছু দুষ্টু লোক সেখানে থাকছে। তাদের চলে যেতে বলা হয়েছে।

সন্ত্রাসী লেলিয়ে খুলশীর বাড়ি থেকে শহীদ রফিকের পরিবারকে উচ্ছেদ চেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে মঈনুল ইসলাম জানান, সরকারি প্রকল্পভুক্ত বাড়িটিতে সয়েল টেস্টের জন্য যন্ত্রপাতি নিয়ে গেলে শহীদ পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ঝামেলা হয়।

রাতের আঁধারে কেন সন্ত্রাসী সঙ্গে নিয়ে সয়েল টেস্টের জন্য যন্ত্রপাতি নিতে হয়েছে জানতে চাইলে—এর কোনোই সদুত্তর মেলেনি গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈনুলের কাছ থেকে।

শহীদ পরিবারের অভিযোগ—এ বিষয়ে অভিযোগ দিতে যান, সিএমপির খুলশী থানায়। কিন্তু সাড়া মেলেনি খুলশী থানা পুলিশের। বরং থানার ওসি নেয়ামত এই শহীদ পরিবারকে বলেন, এসব কোনো কিছুই না। চলে যান বাসায়। পরে ঝামেলা করলে জানাতে পারেন।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!