১৯৮৩ থেকে ২০২৩ সাল—চার দশকের এই ডাক্তারি জীবনে ৭০ হাজারেরও বেশি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন ডা. শিব শংকর সাহা। অস্ত্রোপচার পরবর্তী জটিলতা কম হওয়ায় রোগীদের পছন্দের তালিকার ওপরে রয়েছেন তিনি। হাতের যশের কারণে সারাদেশে রয়েছে তার সুখ্যাতি। অথচ মাধ্যমিকের পর অর্থের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হতে বসেছিল তার।

ডাক্তারি জীবনে নানান চরাই-উতরাই দেখেছেন ডা. শিব শংকর। বহুবার বদলির কারণে একসময় সরকারি চাকরিটাই তিনি ছেড়ে দেন। এরপর থেকে তিনি চট্টগ্রামে থিতু হন। বর্তমানে তিনি ১৫ থেকে ২০ জন রোগী প্রতিদিন দেখেন। দৈনিক গড়ে তিন-চারটি অস্ত্রোপচার করেন।
রোববার (১৮ জুন) কথা হয় অধ্যাপক ডা. শিব শংকর সাহার সঙ্গে। এই সময় তিনি কথার ঝাঁপি খুলে বসেন। তুলে ধরেন শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও পারিবারের কথা। একইসঙ্গে জানিয়েছেন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, বুকের মাঝে চাপা আক্ষেপের কথাও।
১৯৫৮ সালের ৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার স্কুলশিক্ষক শ্যামসুন্দর সাহা ও উমা সাহার ঘরে জন্ম হয় শিব শংকরের। ১০ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। তার বড় তিন ভাই ইঞ্জিনিয়ার, দুই ভাই ডাক্তার। অপর ভাইবোনরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেছে নিয়ে ভিন্ন পেশা।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হরিহরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্যামসুন্দর সাহা। বাবার সেই স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন শিব শংকর। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা। বাবার সেই আদর্শ এখন ধারণ করে আছেন বলে জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন মাধ্যমিক। সেই বছর শতকরা ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল বলে জানান শিব শংকর।
তবে মাধ্যমিকের পর হঠাৎ পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় শিব শংকরের। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অভাবে সংসারে দিশেহারা হয়ে পড়েন তার বাবা শ্যামসুন্দর। তখন তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। এজন্য মাধ্যমিক পাস করা পর তাকে কলেজে ভর্তি করানো যায়নি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অভাব-দুর্দশার মধ্যেই একবছর পর কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করি।’
এরপর শুরু হয় ডাক্তার হওয়ার লড়াই। সুযোগ পান রংপুর মেডিকেল কলেজে। সেই সময়ে সর্বোচ্চ তিনটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল। শিব শংকর ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেন। তখন তার সরকারি চাকরিজীবী বড় ভাই কর্মরত ছিলেন রংপুরে। সেই হিসেবেই রংপুর মেডিকেল কলেজ পছন্দ করেন তিনি। আর পড়ালেখার সুযোগও পান এই কলেজে।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ডা. শিব শংকর সাহা বলেন, ‘আমার বড় তিন ভাই ইঞ্জিনিয়ার, দু’জন ডাক্তার। মেজ ভাই যখন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে পড়তেন, তখন তার কাছে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতাম। ভাইয়ের সঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতাম। মূলত তখন থেকেই ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে জাগে।’
১৯৮৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন ডা. শিব শংকর। এরপর ইন্টার্নশিপ করে চলে আসেন ঢাকা। হলি ফ্যামেলি রেডক্রস হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। সেখানে চার মাস কাজ করার পর বিসিএস না দিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে ইন সার্ভিস ট্রেনিংয়ের সুযোগ পান। সেই সময় ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকত। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে মেডিকেল অফিসার হিসেবে তার প্রথম পোস্টিং হয় টঙ্গিবাড়ি মুন্সিগঞ্জ সাবসেন্টার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
১৯৮৭ সালে আবেদনের প্রেক্ষিতে বরিশাল মেডিকেল কলেজে ফিজিওলজি বিভাগে পোস্টিং দেওয়া হয় ডা. শিব শংকরকে। এরপর ১৯৮৮ সালে সার্জারি উচ্চতর ডিগ্রি নিতে এফসিপিএস ১ম পর্বে পড়ার সুযোগ পান। ওই বছরের শেষের দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জেনারেল সার্জারিতে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন হয় তার।
এভাবে কেটে যায় বছর দেড়েক। ১৯৯১ সালে ডা. শিব শংকর শেষ করেন এফসিপিএস দ্বিতীয় পর্ব। তখন তিনি কর্মরত পিজি হাসপাতালে।
এরপর ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিলেট মেডিকেল কলেজে রেসিডেন্ট সার্জন হিসেবে পদায়ন করা হয় ডা. শিব শংকরকে। সেখানে দু’বছর শেষ হওয়ার পর একই পদে আবারও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বদলি হন। সেখানেও ছিলেন দেড় বছর ছিলেন। এরপর পদোন্নতি দিয়ে জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে তাকে পাঠানো হয়। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিলেন পাহাড়ি জনপদে।
১৯৯৬ সালে ল্যাপারোস্কোপি সার্জারিতে ট্রেনিংয়ের জন্য ঢাকা বারডেম হাসপাতালে চলে যান ডা. শিব শংকর। এরপর চলে আসেন চট্টগ্রামে। ডা. শিব শংকর বলেন, ‘ট্রেনিং শেষে জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম স্যারের প্রতিষ্ঠান ইএসটিসির সহকারী অধ্যাপক (লিয়েন ভিত্তিতে) হিসেবে চাকরি কন্টিনিউ থাকা অবস্থাতেই স্বল্পকালীন সময়ের জন্য সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদানের সুযোগ হয়। সেখানে দু’বছর থাকার পর কুমিল্লা সরকারি মেডিকেলে ১৯৯৮ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করি। দেড় বছর পর সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেলের জেনারেল সার্জারিতে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দিই।’
তবে চাকরি জীবনে ঘন ঘন বদলির বিষয়ে ডা. শিব শংকর বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেলে দেড় বছর থাকার পর ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে দিনাজপুর মেডিকেলে বদলি করা হয়। তখন সিদ্ধান্ত নিই, আর সরকারি চাকরি করব না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত পাঠাই। আবেদনে আমাকে বারবার বিনা কারণে বদলির বিষয়টি উল্লেখ করি। আর সেজন্যই সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে চাই বলে জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘চার বছর অপেক্ষায় ছিলাম মন্ত্রণালয়ের জবাবের। উত্তর না পেয়ে ফাইনালি চাকরি ছেড়ে ইউএসটিসিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দু’বছরের জন্য যোগদান করি। ইউএসটিসিতে ২০০২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলাম। এরপর ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করি।’
কর্মজীবনে সার্জন ডা. গোলাম রসুল, প্রফেসর পি বি রায়সহ আরও কয়েকজন প্রফেসরদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল বলে জানান ডা. শিব শংকর সাহা। তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাদের গুণাগুণ ধারণ করে চিকিৎসায় উৎকর্ষ সাধন করার চেষ্টা করেছি সবসময়। একসময় সব অস্ত্রোপচার করতাম। যখন দেখলাম ভালো সার্ভিস দিতে হবে, তখন চিকিৎসার ব্যাপকতা কমিয়ে দিলাম। কিডনি, থাইরয়েড, প্রোস্টেট অস্ত্রোপচারও করতাম। এগুলো বাদ দিয়ে গলব্লাডার, হার্নিয়া, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজির অস্ত্রোপচারগুলোতে জোর দিলাম।’
ডা. শিব শংকর বলেন, ‘আমার চেম্বারে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ রোগী গলব্লাডারে পাথর, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, হার্নিয়া, পাইলস, ফিস্টুলাসহ জেনারেল ও মেজর অস্ত্রোপচারের।বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী দেখি, এরমধ্যে নতুন ১০ জন ও পুরাতন ১০ জন।’
কম রোগী দেখার বিষয় এই বিশেষজ্ঞ সার্জন বলেন, ‘আমি সময় নিয়ে রোগী দেখি। রোগের ইনভেস্টিগেশন যথাযথ বোঝার চেষ্টা করি। রোগীদের সঙ্গে কথা বলি, সময় দেই। ক্লিনিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক রিপোর্টগুলো সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিই। যাতে রোগীর বেটার আউটকাম আসে।’
তিনি বলেন, ‘সার্জারি পরবর্তী অস্ত্রোপচার জটিলতা বেশি হয়। আমার কাছে পোস্ট অপারেটিভ জটিল রোগী প্রতিদিনই থাকে। কিন্তু আমার অস্ত্রোপচার করা রোগীর অস্ত্রোপচার পরবর্তী জটিলতা কম। চিকিৎসা জীবনের ৪০ বছরে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার অস্ত্রোপচার করেছি আমি।’
সার্জারি চিকিৎসার প্রতি আগ্রহের বিষয়ে ডা. শিব শংকর বলেন, ‘সার্জারি চিকিৎসার আউটপুট নিজের চোখে দেখা যায়। আমি নিজ হাতে অস্ত্রোপচার করলাম, রোগীর রোগটা রিমুভ করলাম, রোগীর সুস্থতা ভিজিবল দেখার তৃপ্তিটাই আমাকে সার্জন হতে সহায়তা করেছে।’
পারিবারিক জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ডা. শিব শংকর। তিন সন্তানই দেশের বাইরে পড়াশোনা করে সেখানে থিতু হয়েছে। পেশায় চিকিৎসক স্ত্রী সুচন্দাও ২২ বছর ইউএসটিসিতে শিশুরোগ বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্মব্যস্ততার কথা বলতে গিয়ে ডা. শিব শংকর বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে ওঠে প্রাতঃরাশ ভ্রমণে যাই। তারপর ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা করে চেম্বারে চলে যাই। সকালে অস্ত্রোপচারগুলো শেষ করি। সকালে নগরীর বেলভিউ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আর বিকালে ম্যাক্স হাসপাতালে রোগী দেখি।’
নিজের সফলতার পেছনে স্ত্রীর অবদানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা জীবনের পুরোটাই আমার বদলি আর যোগদানে কেটেছে। এই বছর এক জেলায় তো পরের বছর অন্য জেলা। তিন সন্তানকে সুচন্দা মানুষ করেছে। ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছে।’
জীবনের প্রাপ্তির কথা বলতে গিয়ে ডা. শিব শংকর বলেন, ‘এক জীবনে সব পেয়েছি। চট্টগ্রাম মেডিকেলে যখন সার্জারি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলাম, আমার ইউনিট ছাড়াও সব ইউনিটেই চষে বেরিয়েছি। রোগীদের ভালোবাসা পেয়েছি। রোগ ছেড়ে যখন একজন রোগী সাধারণ মানুষের কাতারে গিয়ে আমার সাক্ষাৎ পেয়ে উদ্বেলিত হয়, তাদের হাসিমুখটাই আমার সেরা অর্জন বলে মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরি ছেড়ে আমি দেশের বাইরে গিয়ে স্থায়ী হতে পারতাম, কিন্তু হইনি। আমি চেয়েছি, আমি যা চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করেছি, তা দিয়ে এদেশের মানুষের চিকিৎসা করব।’
তবে আক্ষেপ করে ডা. শিব শংকর সাহা বলেন, ‘বারবার বদলির কারণে আমার সরকারি চাকরি করা হয়নি। আমি সরকারি হাসপাতালে থাকলে অনেক গরিব রোগী সেবা পেতো।’
ডিজে