কূটনীতির আড়ালে বার্লিন মিশনে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা, অভিযোগের কেন্দ্রে একজন

বদলি আদেশই মানছেন না ১৪ মাস ধরে

জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে দায়িত্ব পালনরত এক কূটনৈতিক কর্মকর্তাকে ঘিরে ঘটছে একের পর এক নজিরবিহীন কাণ্ডকারখানা। খোদ পররাষ্ট্র সচিবের নির্দেশকে অমান্য করে গত ১৪ মাস ধরে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন কাউন্সেলর (প্রজেক্ট) তানভীর কবির। করাচি মিশনে যোগদানের নির্দেশ অমান্য করে দায়িত্বে থেকে যাওয়া, রাষ্ট্রপতির সফরে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার ইউরো (প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে গড়িমসি, অনুমতি ছাড়াই মামলা পরিচালনা, দূতাবাসের ব্যাংক কার্ড ব্যবহারে অনিয়ম, কর্মচারী ছাঁটাই ও কূটনৈতিক আচরণে বিতর্ক—এমন সব অভিযোগে এখন প্রশ্নের মুখে বার্লিন মিশনের প্রশাসন।

কূটনীতির আড়ালে বার্লিন মিশনে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা, অভিযোগের কেন্দ্রে একজন 1

দ্বিভাষিক নিউজপোর্টাল ‘বাংলা আউটলুকে’ জুলকারনাইন সায়েরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বার্লিন মিশনের অন্দরমহলের এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা কেবল প্রশাসনিক বিচ্যুতিই নয় বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

কূটনীতির আড়ালে বার্লিন মিশনে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা, অভিযোগের কেন্দ্রে একজন 2

বদলির আদেশেও অনড়: চ্যান্সেরির দোহাই দিয়ে বার্লিনে ঘাঁটি

২০২১ সালের অক্টোবর থেকে বার্লিন মিশনে কর্মরত তানভীর কবিরের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, একজন কূটনীতিক সাধারণত একটি মিশনে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বরের স্মারক নং ১৯.০০.০০০০.১১১.৪০.৩৫৯.২০/১০২৩–এর মাধ্যমে তাকে পাকিস্তানের করাচি মিশনে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব চ্যান্সেরি ভবনের কাজের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বার্লিনে থাকার আবেদন করেন, যা তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব প্রত্যাখ্যান করেন। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বরের স্মারক নং ১৯.০০.০০০০.১১১.৪০.৩৫৯.২০/১১৩৩–এর মাধ্যমে তাকে অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই আদেশ জারির ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো বার্লিনেই কর্মরত।

কূটনীতির আড়ালে বার্লিন মিশনে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা, অভিযোগের কেন্দ্রে একজন 3

২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন দূতালয় প্রধান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে বদলি হলে রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে তানভীর কবির দূতালয় প্রধানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের একাধিক নজির সৃষ্টি করেন। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, জার্মানিতে অবস্থানরত একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রবাসী উইংয়ের একজন সদস্য, একই মতাদর্শের মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বার্লিন দূতাবাসের বর্তমান রাষ্ট্রদূত তাকে বদলির পরও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহায়তা করছেন।

কূটনীতির আড়ালে বার্লিন মিশনে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতা, অভিযোগের কেন্দ্রে একজন 4

কোটি টাকার খেসারত: অবহেলায় গচ্চা সাড়ে ৪ কোটি টাকা

২০২২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নির্ধারিত বার্লিন সফরের সময়সূচি শেষ মুহূর্তে পরিবর্তিত হলে হোটেলের অগ্রিম ও গাড়ি ভাড়া বাবদ প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার ইউরো আর্থিক ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও সফরসঙ্গীদের জন্য স্থানীয় একটি কোম্পানি থেকে ২৩টি গাড়ি ভাড়া নেওয়া হয় এবং ৫০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করা হয়। রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে সফরের তারিখ পরিবর্তন হলে কোম্পানিটি চুক্তি অনুযায়ী বাকি ৫০ শতাংশ দাবি করে। দূতাবাস অর্থ পরিশোধ না করায় মামলা হয় এবং আদালত কোম্পানির পক্ষে রায় দেয়। আপিলেও দূতাবাস হেরে যায়, তবে এক মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রাখা হয়।

দূতাবাসের আইনজীবী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত আপিলের পরামর্শ দিয়ে ইমেইলে বিষয়টি দূতালয় প্রধান তানভীর কবিরকে জানান। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর ছিল আপিলের শেষ দিন। এক মাসেও ইমেইলের জবাব না দেওয়ায় শেষ দিনে আইনজীবী টেলিফোনে স্মরণ করালে রাষ্ট্রদূত নিজ উদ্যোগে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে কোম্পানিকে বাকি অর্থ সুদ ও আইনি খরচসহ পরিশোধের অনুমতি চাওয়া হয়। আপিলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অর্থ ছাড় দিলে সরকারের কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অনুমতি ছাড়াই আপিল ও আর্থিক গোলকধাঁধা

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই তানভীর কবির আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে মন্ত্রণালয় মৌখিকভাবে কৈফিয়ত তলব করে। রাষ্ট্রদূতের অনুমতিও তিনি নেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে চাপে পড়ে আপিল প্রত্যাহার করা হয়। আপিল বাবদ জমা অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে না—এ ব্যয় কিভাবে নির্বাহ হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

দূতালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যয়, পরে ব্যাকডেটে রাষ্ট্রদূতের স্বাক্ষর নেওয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কেনা সামগ্রী সরকারি প্রাপ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে না দেখা—এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। জমা স্লিপ ও ব্যাংক ট্রান্সফারের পরিবর্তে যে কোনো খরচে দূতাবাসের ডেবিট কার্ড ব্যবহার, অন্য ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ উত্তোলনে অতিরিক্ত চার্জ গুনতে হওয়া এবং এ খাতে নির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় হিসাব সংরক্ষণে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

দূতাবাসের নিজস্ব ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে সরকারকে জরিমানা গুনতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভবিষ্যৎ অডিটে এসব ব্যয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আপত্তি উঠতে পারে।

‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’: তলোয়ারের নিচে স্থানীয় কর্মচারী

জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অনুপস্থিতি, অপ্রয়োজনীয় নোট ভারবাল প্রেরণ এবং স্থানীয় কর্মচারীদের একাধিক অভিযোগ জমা পড়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০২১ সালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার উদ্যোগে তৎকালীন সরকার তাকে বার্লিনে নিয়োগ দেয়। ৫ আগস্টের পর তিনি অতি বিপ্লবী হিসেবে আবির্ভূত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। গত নির্বাচনের আগে জার্মানিতে অবস্থিত একটি ইসলামী দলের প্রবাসী উইংয়ের পক্ষে কাজ করা এবং একটি ইসলামী এনজিওর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দূতাবাস আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, লেখিকা ও সাংবাদিক নাজমুন নেসা পিয়ারিকে মাঝপথে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আইনসিদ্ধ ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

দূতাবাসে স্থানীয় ও হোম-বেসড কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি এবং ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি অনুসরণের অভিযোগও রয়েছে। দ্বিতীয় বিবাহের অভিযোগে মো. শরীফ হোসেন নামে আট বছর কর্মরত এক স্থানীয় কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। তার অভিযোগ, ডিপোর্টেশনের ভয় দেখিয়ে আইনজীবী এনে একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে জোরপূর্বক অব্যাহতিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। চার মাসের নোটিশের কথা উল্লেখ থাকলেও তাকে দুই মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশে ফিরে এলে আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছেন এবং অডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করেছেন বলে জানিয়েছেন।

৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত এক জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুতের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে রাষ্ট্রদূতের হস্তক্ষেপে তা হয়নি। সম্প্রতি ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়ে ফেরা এক জার্মান নারী কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুতের প্রচেষ্টা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় এক জার্মান নারী কর্মচারীর সঙ্গে অপেশাদার আচরণের অভিযোগও ওঠে। ভাউচার কোড ইস্যু নিয়ে শত শত দর্শনার্থীর সামনে তাকে উচ্চস্বরে তিরস্কার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অভিযোগটি রাষ্ট্রদূতের কাছে জানানো হলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি ন্যাশনাল বুক সেন্টার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেন। সাড়া না পেয়ে জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসে বিষয়টি জানান। তৎকালীন পরিচালক আফসানা বেগমও রাষ্ট্রদূতের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অতীতের ছায়া: জেদ্দা থেকে মেক্সিকো

বার্লিন মিশনে কর্মরত এক সাবেক কূটনৈতিক বাংলা আউটলুককে জানান, তানভীর কবিরের এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। ২০১৩ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় পোস্টিংয়ের প্রথম মাসেই এক এনএসআই কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হাতাহাতির ঘটনায় তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মেক্সিকোতে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমার অভিযোগে ২০১৭ সালে সরকারি বিধি লঙ্ঘন ও অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তাকেও দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

সিপি

ksrm