চট্টগ্রামের হাসপাতালে যৌন হয়রানির অভিযোগ নারী কর্মীর, তদন্তে শ্রম অধিদপ্তর
অভিযোগ তুলতেই চাপ, চাকরি ছাড়ার পরামর্শ
চট্টগ্রাম নগরের মেহেদীবাগে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতাল ম্যাক্স হাসপাতাল লিমিটেড–এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফয়সাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যৌন হয়রানি, বডি শেমিং ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির ইকো বিভাগে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মরত এক নারী কর্মী লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও মানসিক চাপে রয়েছেন তিনি। অভিযোগের প্রতিকার চাইতে গিয়ে উল্টো তাকে অভিযোগ প্রত্যাহার ও অন্যত্র চাকরি খোঁজার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর আগেও একই হাসপাতালে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল বলেও জানা গেছে।
ব্যক্তিগত প্রশ্ন, মানসিক চাপ
গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানের ম্যাক্স হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী ওই নারী উল্লেখ করেন, মহাব্যবস্থাপক মো. ফয়সাল উদ্দিন বিভিন্ন সময় কাজের বাইরের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতেন। তার বাসা কোথায়, বেতন কত, ওই বেতনে পরিবার চলে কি না—এ ধরনের প্রশ্ন তুলে তাকে বিব্রত ও মানসিকভাবে চাপে রাখা হতো বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ তার জন্য অপমানজনক ও অস্বস্তিকর ছিল বলে ওই নারী উল্লেখ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অফিস শেষে দেরি হলে ওই কর্মকর্তা তাকে ব্যক্তিগতভাবে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিতেন। নারী কর্মীর ভাষ্য, এ ধরনের প্রস্তাব তার কাছে সন্দেহজনক ও অনভিপ্রেত মনে হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া কক্ষে প্রবেশ, বডি শেমিংয়ের অভিযোগ
ইভিনিং শিফটে দায়িত্ব পালনকালে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলের কক্ষে প্রবেশ করে তার শারীরিক গঠন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ধারাবাহিক এ পরিস্থিতির কারণে তিনি পরে নিজের ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন করে মর্নিং শিফটে নেন বলে জানান।
সাম্প্রতিক সময়েও তার হাসি ও ঠোঁটের সাজ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। একটি অডিও রেকর্ড নিজের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন, যেখানে তাকে উদ্দেশ করে ‘আপনি কী সুন্দর হাসতেছেন দেখেন তো। লিপস্টিকটা কত দারুণ লাগতেছে’—এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়, এ ধরনের আচরণ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬–এর ৩৩২ ধারা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী।
অভিযোগ তুলে নিতে চাপ
ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর সন্তোষজনক প্রতিকার না পেয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পলিটেকনিক রোডে অবস্থিত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর–এর উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, অভিযোগের কপি সংযুক্ত করে বিষয়টি অবহিত করার পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় তাকে হাসপাতালে ডাকা হয়। সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. রিঙ্কু দাশসহ আরও পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন। তার দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে তাকে অভিযোগ প্রত্যাহার করে অন্যত্র চলে যেতে চাপ দেওয়া হয় এবং এ চাপ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত, কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তারা যা বললেন
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাক্স হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক মো. ফয়সাল উদ্দিন বলেন, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ। একটি মহল তাকে মানসিকভাবে চাপে রাখতে এবং চাকরি ছাড়তে বাধ্য করতেই এ অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর কাছে এ ধরনের কোনো প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মাহবুব হাসান বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রম পরিদর্শক গোবিন্দ মজুমদারকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



