খাতুনগঞ্জের পণ্য পথে চুরি হয়ে আবার ফিরে আসে খাতুনগঞ্জেই, চক্রে তিন ধরনের লোক
সস্তায় চুরির মাল কিনতে রাতভর খোলা থাকে রাস্তার মুদি দোকান
দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে পাইকারি দরে কেনা ভোগ্যপণ্য চুরি হয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে যাওয়ার পথে। ঘটনা বড় হলেও এতোদিন ধরে বিষয়টি অনেকটা আড়ালেই থেকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে এই ধরনের চুরির ঘটনায় সচরাচর ট্রাকচালক ও হেলপারদের দায়ী মনে করা হলেও এবার দেখা গেছে, এই ধরনের মালামাল চুরির জন্য খাতুনগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড়সড় এক সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটে ট্রাকচালক ও হেলপাররা তো আছেই, এদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত খাতুনগঞ্জের পাইকারি দোকানদারসহ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিও। পাশাপাশি রাতের বেলা কোনো ক্রেতা না থাকার পরও মহাসড়কের আশেপাশের মুদি দোকানগুলো সারা রাত ধরে খোলা রাখা হয় মূলত এসব চোরাই মাল কেনার জন্যই।
খাতুনগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে চুরি হয়ে যাওয়া ১৪ টন ডালের (৫৬০ বস্তা) একটি চালান উদ্ধার করতে গিয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানা পুলিশের তদন্তে। গত ৮ জানুয়ারি খাতুনগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে উধাও হয়ে যাওয়া এই ৫৬০ বস্তা ডালের মধ্যে ৩৯৫ বস্তা ডাল দুটি অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এর মধ্যে ২০০ বস্তা উদ্ধার হয়েছে পটিয়ার শান্তিরহাটের একটি দোকান থেকে। বাকি ১৯৫ বস্তা ডাল উদ্ধার হয়েছে খাতুনগঞ্জের একটি পাইকারি দোকান থেকে। খাতুনগঞ্জ থেকে নেওয়ার পথে চুরি হওয়া এসব ডাল বিভিন্ন হাত ঘুরে আবার ফিরে যায় খাতুনগঞ্জেই।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত ৮ জানুয়ারি খাতুনগঞ্জের আরএ ট্রেডার্স থেকে নারায়ণগঞ্জের লোকনাথ ফুড ইন্ড্রাস্টিতে ৫৬০ ব্যাগ ডাল পাঠানোর জন্য বিউটিফুল ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়। সেটি ৮ জানুয়ারি রাতেই নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। কিন্তু এরপর থেকে গাড়িটির চালকসহ হেলপারের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মোবাইলও বন্ধ ছিল।’
ওসি নেজাম বলেন, ‘পরে ১১ জানুয়ারি এই ঘটনায় গাড়ির চালক, হেলপার ও ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিকসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন আরএ ট্রেডার্সের ম্যানেজার আবু নাছের মিয়াজি। সেদিন রাতেই ডালবাহী ট্রাকটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় কর্ণফুলীর মইজ্যার টেক থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে দুই দফা অভিযানে মোট ৩৯৫ বস্তা ডাল উদ্ধার করা হয়। এই চুরির সাথে জড়িত চারজনকে এখন পর্যন্ত আটক করা হয়েছে।’
গ্রেপ্তার হওয়া এই চারজন হলেন— বিউটিফুল ট্রান্সপোর্টের মালিক নুরুল হক, রোজিনা আক্তার (৩৬), মোঃ হেলাল উদ্দিন (২৮), মো. আলমগীর (৩০)। এদের মধ্যে হেলাল উদ্দিন পটিয়ার শান্তির হাটের গাউসিয়া স্টোরের মালিক এবং মো. আলমগীর খাতুনগঞ্জের জোনায়েদ এন্টারপ্রাইজের মালিক।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার উপ পরিদর্শক মেহেদী হাসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মূল্যের ডাল নিয়ে যাওয়া ট্রাকটির চালকের নাম ছিল মো. রিয়াদ (১৯)। ওই ট্রাকের হেল্পার ছিল দুজন— একজনের নাম রাকিব, অন্যজনের নাম সাকিব। ৯ জানুয়ারি সকালে তারা নারায়ণগঞ্জ না পৌঁছানোয় ওইসব ডালের মালিক তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তাদের মোবাইল বন্ধ পান। মোবাইল বন্ধ থাকায় এই মালামাল উদ্ধারে আমাদের হাতে কোনো ক্লু ছিল না। তবে মামলার সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের লোকজনের সাথে কথা বলার পর এই মামলার জট খুলতে শুরু করে।’
এই ঘটনার সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক নুরুল হকের সম্পৃক্ততার বিষয়ে মেহেদী হাসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে এজেন্সির মাধ্যমে ওই ট্রাক ঠিক করা হয়, সেই এজেন্সির মালিকের কথাবার্তায় আমাদের সন্দেহ হয়। আরএ ট্রেডার্সের মালিকও তাকে মামলায় আসামি করে। পরে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক নুরুল হককে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তার দেওয়া তথ্যেই ১১ জানুয়ারি রাতে মইজ্যারটেক এলাকা থেকে ডালবাহী ট্রাকটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করি আমরা। তবে ডালগুলো তখনও পাওয়া যায়নি। চালক আর হেলপারদের বিষয়েও নুরুল হক কোনোরকম তথ্য দিতে পারেননি।’
এরপর ট্রাকটির চালক ও হেলপারদের পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি শুরু করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এর মধ্যে একজন হেলপার সাকিবের মা ফেনী থেকে হুট করে বাঁশখালী চলে গেলে বিষয়টিকে আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এর জের ধরেই কোনো ক্লু না থাকা এই ঘটনাটির রহস্যের জট খুলতে শুরু করে।
এই রহস্যের বিস্তারিত জানিয়ে মেহেদী হাসানের টিমে থাকা আরেক উপ পরিদর্শক মিজানুর রহমান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের হাতে যখন আর কোনো ক্লু নেই, তখন আমরা ওই ট্রাকের চালক ও দুই সহযোগীর পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি শুরু করি। এর মধ্যে সাকিবের মা রোজিনা আক্তার এই চুরির ঘটনার পর হঠাৎ ফেনী থেকে বাঁশখালী চলে গেলে তাকে আমাদের সন্দেহ হয়। বাঁশখালীর কাথরিয়া গিয়ে ১৬ জানুয়ারি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি আমরা। এর একপর্যায়ে সাকিবের মা মালামাল চুরি এবং চুরির পরে বিক্রি করে দেওয়ার কথা জানায়। রোজিনা জানান, সব ডালই বিক্রি করা হয়েছে পটিয়ার শান্তিরহাটের গাউসিয়া স্টোরে। ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকার ডাল গাউসিয়া স্টোর কিনে নেয় ৬ লাখ টাকায়।’
পরে রোজিনা বেগমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেদিনই গাউসিয়া স্টোরের গোডাউন থেকে ২০০ বস্তা ডাল উদ্ধার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। বাকি ডালের বিষয়ে জানতে চাইলে গাউসিয়া স্টোরের মালিক হেলাল উদ্দিন পুলিশকে জানান, কিছু ডাল নিজেরা রেখে বাকি ডাল খাতুনগঞ্জের জোনায়েদ এন্টারপ্রাইজের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে তারা। জোনায়েদ স্টোর থেকে তারা নিয়মিত পাইকারি মালামাল কিনলেও বিভিন্ন সময়ে কেনা চোরাইমালও আবার জোনায়েদ এন্টারপ্রাইজেই বিক্রি করে তারা। নিজেদের কাছে রাখা ডালের মধ্যে ৩০ ব্যাগ খুচরাও বিক্রি করে গাউসিয়া স্টোর। পর দিন ১৭ জানুয়ারি খাতুনগঞ্জের জোনায়েদ এন্টারপ্রাইজ গোডাউন থেকে ১৯৫ বস্তা ডাল উদ্ধার করে পুলিশ। তবে জোনায়েদ এন্টারপ্রাইজও এর মধ্যেই বেশকিছু ডাল বিক্রি করে দিয়েছে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পথে প্রায়ই ভোগ্যপণ্য চুরি হয়ে যায়। অনেক মালামাল উদ্ধারও হয়। তবে এই মামলায় দুটি নতুন বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো মহাসড়কের পাশে প্রচুর মুদি দোকান সারা রাত খোলা থাকে। এসব দোকানে বেচাকেনা থাকে না ওই টাইমে। তবু এগুলো খোলা থাকে এমন চোরাই পণ্য কিনতে। আবার খাতুনগঞ্জ থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পথে চুরি যাওয়া পণ্য বিভিন্ন হাত ঘুরে আবার বিক্রি হয় খাতুনগঞ্জের বাজারেই।’
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত চালক ও দুই হেলপারসহ অজ্ঞাত বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। উদ্ধারের বাকি আছে ৬৫ বস্তা ডালও।
সিপি