চট্টগ্রামের ইনডোরে ইলিশ চাষে নামছে প্রাণ-আরএফএল, প্রযুক্তি ডেনমার্কের

নদীর স্রোত ছেড়ে এবার ইনডোর পদ্ধতিতে ইলিশ চাষে নামছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সামুদ্রিক মাছ ইলিশ, এশিয়ান সিবাস ও গ্রুপার চাষের শিল্প প্রকল্প করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রকল্পে প্রতিটি ইলিশের গড় ওজন হবে ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৫০০ গ্রাম।

প্রাণ-আরএফএলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হবিগঞ্জ অ্যাগ্রো লিমিটেড এবং ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার মধ্যে এ লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। যৌথভাবে দুই বছরে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে এই প্রকল্পে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর বাড্ডায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। হবিগঞ্জ অ্যাগ্রো লিমিটেডের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক নাসের আহমেদ এবং এ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার পক্ষে ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ইয়েনস ওলে ওলেসেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়ে এতে স্বাক্ষর করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা, এ্যাসেনটপ্টের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মারিস্কোর ম্যানেজিং পার্টনার থমাস সুদারলিন্ড, এ্যাসেনটপ্টের কান্ট্রি ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন মো. ইউসুফ এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আমিনুর রহমান।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আরএএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইনডোর ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ চাষ করা হবে। প্রকল্পটি চট্টগ্রাম বিভাগের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অথবা উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত উপযুক্ত স্থানে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিটি মাছের গড় ওজন হবে ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৫০০ গ্রাম। উৎপাদিত মাছের বড় অংশ রপ্তানি করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণেও সরবরাহ থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা বলেন, দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে সামুদ্রিক মাছের চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে আরএএস পদ্ধতিতে মাছ চাষে যেতে চায় প্রাণ গ্রুপ। উন্নত দেশগুলোতে স্বল্প জায়গায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছ চাষ হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শিল্প পর্যায়ে সিবাস মাছ উৎপাদন শুরু হবে।

এ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার ইয়েনস ওলে ওলেসেন বলেন, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মারিস্কো এপিএস ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে মাছ চাষে কাজ করছে। বাংলাদেশে আরএএস প্রযুক্তিভিত্তিক একটি মাছ চাষ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ড্যানিশ সরকারের অর্থায়ন ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি ব্রুডস্টক সুবিধাসহ হ্যাচারিও থাকবে বলে তিনি জানান।

আরএএস প্রযুক্তি কিভাবে কাজ করে

রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম বা আরএএস হলো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ইনডোর মাছ চাষ পদ্ধতি। এখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে পানির গুণগত মান, তাপমাত্রা, অক্সিজেন, লবণাক্ততা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একই পানি পরিশোধন করে বারবার ব্যবহার করা হয়, ফলে পানির ব্যবহার কমে এবং প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় রোগের ঝুঁকিও কম থাকে। এই প্রকল্পের আওতায় ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা, হ্যাচারি ও নার্সারি সুবিধাসহ পুরো উৎপাদন চেইন গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইলিশের লক্ষ্য ওজন ধরা হয়েছে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি।

ইলিশ কি চাষযোগ্য?

ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। দীর্ঘদিন ধরে এটিকে চাষের অনুপযোগী হিসেবেই ধরা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশ পালনের গবেষণা শুরু হয়েছে। বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনও বিরল। সে কারণে প্রাণ-আরএফএল ও এ্যাসেনটপ্টের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক পরিসরেও ব্যতিক্রমী।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে ইলিশ চাষ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইলিশের জীবনচক্র ও প্রজনন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। এখন পর্যন্ত ইলিশ চাষের কোনো সফল নজির নেই। তবে সফল হলে প্রাকৃতিক নদী ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি হবে।

ksrm