চট্টগ্রামে অচেনা মাফিয়া খেলছে গরিব ট্যাক্সিচালককে ‘বড় আমদানিকারক’ সাজিয়ে

ভয়ে পালিয়ে গেছেন সেই চালক, ট্যাক্সিও বেচে দিয়েছে পরিবার

0

কাগজপত্রে চট্টগ্রামের বড় ‘আমদানিকারক’ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুরের সেই সিএনজি অটোরিক্সাচালক নিজাম উদ্দিন শরীফ ভয়ে বাড়ি থেকেই পালিয়ে গেছেন। বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তার চালানো সিএনজি অটোরিক্সাটিও। পরিবারের সদস্যরাও জানেন না, তিনি এখন কোথায়। ফটিকছড়ির গ্রামে দিনরাত সিএনজি চালিয়ে পরিবারের মুখে দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়াই যার কাছে রীতিমতো কষ্টকর— ২৬ বছর বয়সী সেই দরিদ্র তরুণটির নামে চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে আমদানিকারকের লাইসেন্স, বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিন), ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাইলও। এই সবের সাথে মিল রেখে রয়েছে বিপুল অংক লেনদেনের ব্যাংক হিসাবও।

৫ কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকির চেষ্টা করা বিপুল এই বিদেশি সিগারেটের আমদানিকারক ফটিকছড়ির ট্যাক্সিচালক— শুনেই সবাই অবাক!
৫ কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকির চেষ্টা করা বিপুল এই বিদেশি সিগারেটের আমদানিকারক ফটিকছড়ির ট্যাক্সিচালক— শুনেই সবাই অবাক!

অথচ বাস্তবে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুরে সিএনজি অটোরিক্সা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন নিজাম উদ্দিন শরীফ। এলাকার সবাই তাকে ‘সিএনজিচালক’ হিসেবে চিনলেও চট্টগ্রাম নগরীর ফলমণ্ডির ঠিকানায় ‘মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুট’ নামে বিদেশ থেকে ‘ফল আমদানিকারক’ও তিনি। তার নামে কিছুদিন আগে আমদানি করা হয় এক কনটেইনার আপেল। আর ওই চালানে অবৈধভাবে নিয়ে আসা হয় সাড়ে ৫ কোটি টাকার সিগারেট— যা কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে জব্দ হয়।

সিগারেট জব্দ করার ঘটনায় দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় এই শরীফকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক অভিযানে আপেলের ঘোষণা দিয়ে ২২ লাখ ১৯ হাজার শলাকা বিদেশি সিগারেট একটি চালান ধরা পড়ে। শুধু ওই এক চালানেই ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল। কাস্টমসে দেওয়া কাগজপত্রে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ফলমন্ডির মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুট নামের একটি প্রতিষ্ঠান আরব আমিরাত থেকে এ চালান নিয়ে আসে চট্টগ্রাম বন্দরে। আর এতো বড় চালানের আমদানিকারক যিনি, তার নাম নিজাম উদ্দিন শরীফ। ২৬ বছর বয়সী শরীফের নামে রয়েছে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিন), ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাইলও। এই সবের সাথে মিল রেখে রয়েছে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের ব্যাংক হিসাবও।

কিন্তু কাস্টমস ছাড়াও চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কথিত এই বড়মাপের ‘আমদানিকারক’ নিজাম উদ্দিন শরীফ প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুরের একজন দরিদ্র সিএনজি অটোরিক্সাচালক। এলাকার সবাই তাকে ‘সিএনজিচালক’ হিসেবেই চেনেন। এমন ঘটনায় এলাকাবাসী ছাড়াও বিস্মিত হয়ে যান কাস্টমস কর্মকর্তারাও।

এ নিয়ে চট্টগ্রাম প্রতিদিনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর অটোরিক্সাচালক নিজাম উদ্দিন শরীফ তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম অটোরিক্সাটি রেখে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। পরে তার বাবা ওই অটোরিক্সা মাত্র ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন।

রোববার (৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ধর্মপুর ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ফকিন্নির দিঘীর পাশেই বুধা গাজী প্রকাশ বুধার বাপের বাড়ি। মসজিদের পাশেই টিনশেডের একটি সেমিপাকা ঘর। সেখানে থাকেন শরীফরা। বাড়িজুড়ে এক ধরনের নীরবতা। খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এলেন শরীফের মা-বাবা। ঘরে বসেই কথা হয় মোহাম্মদ শফি ও সোলতানা রেজিয়ার সাথে। এরপর শরীফের অপর দুই ভাইও এলেন সামনে।

শফি-রেজিয়ার এক মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে নিজাম উদ্দিন শরীফ দ্বিতীয়। বড় ছেলে মোহাম্মদ জামাল একসময় বিদেশে থাকলেও ৫ বছর ধরে বেকার। ছোট ছেলে মোহাম্মদ নাঈম স্থানীয় লায়লা কবীর কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। বাবা মোহাম্মদ শফি দীর্ঘদিন প্রবাসজীবন কাটিয়ে এখন বাড়িতেই থাকেন। তিনি হার্টের রোগী। বাবাসহ পরিবারের সবাই বেকার হওয়ায় সংসারের হাল ছিল সিএনজিচালক শরীফের ওপরেই।

শরীফের বাবা মোহাম্মদ শফি বলেন, ‘সিগারেট আমদানির বিষয়টি আমি শুনেছি। কিন্তু এ নিয়ে শরীফের সাথে কোনো কথা বলার আগেই সিএনজি রেখে সে নিখোঁজ হয়ে গেছে। তার সাথে আমরা কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারছি না। আমি নিজেও অসুস্থ। আমাকে বিস্তারিত কিছু কেউই জানাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে শরীফ সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতো। পরিবারের মুখে দু মুঠো ভাত জোটানোর ভারও তার ওপরেই। আমার ছেলেকে কেউ ফাঁসিয়েছে। দিনরাত সিএনজি চালিয়ে এমন কাজ করা তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না। তার সাথে যোগাযোগ হলে আমি বলবো মিডিয়াকে সব জানানোর জন্য।’

শরীফের মা সোলতানা রেজিয়া কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন, ‘অনেক অভাব-অনটনের সংসার আমার। ২৬ বছর বয়সের আমার এ ছোট ছেলেকে যারা ব্যবহার করে এ অপরাধজনক কাজ করিয়েছে, আল্লাহ তাদের বিচার করুক।’

তার বড় ভাই মোহাম্মদ জামাল বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি মামলা থেকে শরীফের বাঁচার উপায় নেই। কিন্তু কে বা কারা তাকে এ ঘটনায় জড়ালো শরীফ নিশ্চয় জানে। আমিও জানতে চাই, এর পেছনে কার হাত ছিল। শরীফ নিখোঁজ থাকায় আমার সন্দেহ হচ্ছে এ মাফিয়ারা তার কোনো ক্ষতি করে বসবে কিনা।’

ফটিকছড়ির ধর্মপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুল হক বলেন, ‘শরীফ আমার সদ্যসমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে সিএনজি নিয়েই প্রচারণার কাজ করেছে। তাই তাকে আমি ভাল করেই চিনি। গরিব পরিবারের ছেলে হওয়ায় সে সিএনজি চালিয়ে সংসার চালায়। অভাব অনটনে দিন কাটে। প্রথমেই শুনে আমি অবাক হয়েছি। সে কিভাবে একজন আমদানিকারক হবে? সেটা তার দ্বারা কোনোভাবেই সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘কোনো মাফিয়ার ফাঁদে পড়ে সে এ কাজ করতে পারে। কিন্তু সেটি সে স্বীকার না করা পর্যন্ত জানা যাবে না।’

আগেই জানা গেছে, আপেলের কন্টেইনারে বিদেশি সিগারেট আনার ওই চালানের আমদানিকারক হিসেবে ব্যবহার করা ঠিকানা চট্টগ্রাম নগরীর রেলওয়ে মার্কেটের ফলমন্ডিতে ‘মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুট’ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার হয়েছে পণ্যের ওই চালানে।

এর আগে ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগ্রেশন এন্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার অভিযানে দেখা যায়, আপেলের ঘোষণায় সিগারেট এনে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করেছে চট্টগ্রামের ফলমন্ডির মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নগরের কোতোয়ালী থানাধীন রেলওয়ে সুপার মার্কেট বা ফলমন্ডির ঠিকানা ব্যবহার করা ওই আমদানিকারক আরব আমিরাত থেকে এ চালান নিয়ে আসেন চট্টগ্রাম বন্দরে। ওই চালানে ২২ লাখ ১৯ হাজার শলাকা সিগারেট পাওয়া গেছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, পণ্যচালানটি আমদানির লক্ষ্যে ডাচ বাংলা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৬ ডিসেম্বর এলসি (নম্বর: 0000167421010114) ইস্যু করা হয়। আমদানি করা এক কন্টেইনার (TRLU1734074×40′) পণ্য খালাসের লক্ষ্যে জন্য সিএন্ডএফ এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয় চট্টগ্রামের মাদারবাড়ির জিমি এন্টারপ্রাইজকে। ওই সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান গত ২০ ডিসেম্বর পণ্যের চালানটি খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে।

ফটিকছড়ির সিএনজিচালক শহরে এসেই কিভাবে রীতিমতো বড় আমদানিকারক— এই হিসাব মেলাতে পারছেন না চট্টগ্রামের কাস্টমস কর্মকর্তারাও। তবে কাস্টমসের কর্মকর্তাদের ধারণা, নিজাম উদ্দিন শরীফের পেছনে বড় কারও না কারও হাত আছে। এখন তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে কাস্টমস হাউস।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার সালাউদ্দিন রেজভী জানান, ‘প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা সব ভুয়া ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে আমাদের।’

ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুনাওয়ার মুরসালীন বলেন, নকল ব্যান্ডরোল ও সিগারেট আমদানির বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। আমরা বেশ কিছু ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেছি। এই চক্রের সাথে আর কোন্ কোন্ প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে তা খুঁজে বের করা হবে।

কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই আমদানিকারক পেশায় সিএনজিচালক। এর আগেও একজন আমদানিকারক পেশায় মূলত রংমিস্ত্রি বলে শুনেছি। আসলে এদের ব্যবহার করে অন্য কেউ এ ধরনের পণ্য চালান আমদানি করছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক আছি। তদন্ত করে এদের পেছনে কাদের হাত রয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হবে।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm