চট্টগ্রামে নিয়ম না মেনেই চলছে মাটি খোঁড়াখুঁজির কাজ। নির্দিষ্ট পরিধির বাইরে গিয়ে মাটি কাটা, সেফটি হার্নেস ছাড়া পাইপলাইনে শ্রমিকদের নামানো, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করাসহ প্রকৌশলীদের অবহেলার কারণে ঠিক মতো কাজের মনিটরিংও হয় না। এসব কারণে সাত বছরে ‘পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন’ প্রকল্পটির ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ দু’দফা মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুনেই প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। একইসঙ্গে প্রকল্পে শ্রমিকদের কাজে নেওয়ার আগে করা স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করানো হয় না। এমনকি প্রকল্পের চুক্তিতে ডাক্তার নিয়োগের কথাই উল্লেখ নেই।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভোরে নগরীর আগ্রাবাদের এক্সেস রোডে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িতে মাটি ধসে পড়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানাই কাতরাচ্ছেন আরও দুইজন। নিহতরা হলেন—মো. রাকিব (৩০) ও মো. আইনুল ইসলাম (তুষার)। আর আহত সাগর ও এরশাদ চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মূলত নির্ধারিত সীমানার বাইরে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী। বেশি মাটি কেটে ফেলার কারণে এমনটি হয়েছে বলে কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
নিয়ম না মেনে কাটা হয় মাটি
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় পাইপ বসানোর আগে মাটি খুঁড়ে মাটির অবস্থা যাচাইয়ের কাজ চলছিল। প্রায় আড়াই মিটার মাটি খোঁড়া হয়েছিল। একপর্যায়ে যন্ত্রপাতিসহ মাটিচাপা পড়েন শ্রমিকরা।
চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আমাদেরকে জোর করে নির্ধারিত সীমানার বাইরে কাজ করিয়ে নিচ্ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী রাব্বী। যেখানে মাটি খনন করা হচ্ছিল, সেখানে লম্বায় ২ মিটার, ডাউনে ৩৫৫০ ডিপ করার কথা ছিল। প্রকৌশলী জোর করে ৬ মিটার ও ডাউনে ৩৬৫০ করতে বলে। আমরা বিরোধিতা করলেও প্রকৌশলী আমাদের কথা শুনেননি। পাশেই ছিল আরেকটি খনন কাজ। আমরা যখন ২ মিটারের বেশি খনন করতে যাই, তখনই ওপর থেকে মাটি ধসে আমাদের ওপর পড়ে।
প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, পাইপ বসানোর আগে মাটির অবস্থা যাচাই করতে ‘ট্রায়াল পিট’ করা হয়। বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে এ কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই অধিকাংশ শ্রমিকদের
আগ্রাবাদের এক্সেস রোডের দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে সরেজমিন দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল না।
প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্যুয়ারেজ বা পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মাস্ক, গ্লাভস, বুট বা কভারঅলের মতো প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ করা হয় না। মিথেনসহ ক্ষতিকারক গ্যাসের সংস্পর্শে আসেন তারা। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, হৃদরোগ এবং গুরুতর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সরঞ্জাম দেওয়া হয়, কিন্তু সচেতনতার অভাব বা অস্বস্তিকর হওয়ার কারণে অনেক শ্রমিক তা ব্যবহার করেন না।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর সঠিক প্রয়োগ ও তদারকির অভাব রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, শ্রমিকদের মাথার সুরক্ষায় হেলমেট, নিরাপত্তা জুতো (ওয়াটারপ্রুফ এবং শক্ত সুতলির বুট) বিষাক্ত গ্যাস এবং দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে মাস্ক এবং বদ্ধ স্থানে কাজ করলে অক্সিজেন সরবরাহকারী মাস্ক দিতে হয়। রাসায়নিক ও সংক্রামক বর্জ্য থেকে বাঁচার জন্য দিতে হয় রাবার বা কেমিক্যাল-রেসিস্ট্যান্ট গ্লাভস। নিরাপত্তা চশমা বা ফেস শিল্ড, উজ্জ্বল পোশাক ব্যবহার করা হয় রাতের কাজ বা দৃশ্যমানতার জন্য। সেফটি হার্নেস ব্যবহার করা হয় গভীর ম্যানহোলে বা পাইপলাইনে নামার সময়।
এছাড়াও নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নতুন শ্রমিকদের জন্য রাখতে হয় ইন্ডাকশন ট্রেনিং এবং অগ্নি নিরাপত্তা, জরুরি নির্গমন প্রক্রিয়ার ওপর প্রশিক্ষণ।
বদ্ধ স্থানে নামার আগে বিষাক্ত গ্যাস আছে কিনা, তা পরীক্ষার জন্য গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহার করার নিয়ম রয়েছে। গভীর পাইপলাইন স্থাপনের (৭ থেকে ১৪ মিটার গভীরে) ক্ষেত্রে মাটি ধস রোধে সাপোর্ট সিস্টেম ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সেসবের কিছুই ছিল না আগ্রাবাদের এক্সেস রোডের দুর্ঘটনাকবলিত সেই খনন কাজে।
হয় না স্বাস্থ্য পরীক্ষা
এই প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাইপ বসানোর কাজ করছে ‘হাইড্রো চায়না কর্পোরেশন’। তবে শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা গেছে, কাজে আসার সময় কখনও তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না। নিরাপত্তাসামগ্রীর ব্যবহারের কথা বললেও অর্ধেক শ্রমিক সব সরঞ্জামাদি পান না।
পিডি আরিফুল ইসলাম বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় ৬০ থেকে ৭০টি স্পটে কাজ হচ্ছে। এক হাজার থেকে ১২০০ জন শ্রমিক কাজ করছে। কিন্তু এসব শ্রমিকদের তো আমরা কোনো এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাই না। আর সে সুযোগও নেই প্রকল্পে। তবে কাজে যাওয়ার প্রতিদিন শ্রমিকদের সেফটি মিটিং হয়। তাদেরকে নানান পরামর্শ দেওয়া হয়।
৭ বছরে হয়েছে ৬৫ শতাংশ কাজ
চট্টগ্রাম মহানগরের ‘পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, দৈনিক ১০ কোটি লিটার পরিশোধনক্ষমতার একটি পয়ঃশোধনাগার, দৈনিক ৩০০ ঘনমিটার সক্ষমতার একটি সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্যশোধনাগার এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার পয়োনালা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ ৭ বছর পার হলেও এখনও অসম্পূর্ণ। কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। এছাড়া প্রকল্পের কাজে অনিয়ম এবং ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ফাটলের অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা নিয়ে দুদক তদন্ত করছে।
তবে নির্মাণকাজ শুরু হয় প্রায় তিন বছর পর। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। ৬০০ কোটি টাকা বেড়ে এখন প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। তবে ব্যয় বাড়ানোর চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষে করার কথা থাকলেও দুই দফায় বাড়ানো হয় মেয়াদ। এরপরও সেই সময়ে কাজ শেষ হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ডিজে



