রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের (সিসিএস) বেড়েছে বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা। এখানে ঢুকতে ঠিকাদারদের পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হলেও তাদের সঙ্গে অনেকে ঢুকে পড়েন। আবার অনেকে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই সেখানে ভিড় জমান। অথচ এ দপ্তরে রয়েছে দুটি গোডাউন। যেখানে দেশি-বিদেশি দামি মালামালের সঙ্গে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ।
দপ্তরের প্রবেশমুখে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এমনটা হচ্ছে। আবার প্রবেশে বাধা দিলে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যদের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দপ্তরের এ এলাকাটি কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টেশন) জোন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ কোনো এলাকা বা স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হলে এসব জায়গাকে কেপিআই জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকে। এখানে দুটি বড় গোডাউন আছে, যেখানে রেলের দেশি-বিদেশি মালামাল মজুদ থাকে। সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থও এসব গোডাউনে রাখা হয়। এসব দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে—পেট্রোল, কেরোসিন, ডিজেল, বিভিন্ন ধরনের লুব ওয়েল, নেলকো, এসিড, ফাক সিগন্যাল, ব্যাটারি, বিভিন্ন ধরনের রং, গানি ব্যাগ, ক্যাবেল, ফাইবার বোর্ড, ফ্লোরিং কম্পোজিশন ইত্যাদি। এজন্য গোডাউনের বাইরের দেয়ালে সাঁটানো আছে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। তাই এসব এলাকায় প্রবেশের অধিকারও সংরক্ষিত।
যেসব ঠিকাদার এখানে আসেন তাদের জন্য পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। যাদের পরিচয়পত্র নেই তাদের প্রবেশে নিষেধ আছে। কিন্তু এরপরও ঠিকাদারদের সঙ্গে অনেকে দলবল নিয়ে ঢুকে পড়েন। আবার অনেকে এমনিতেই আড্ডা দেন দপ্তরের ভেতরে ঢুকে। আরএনবি সদস্যরা বাধা দিলে তাদের লাঞ্ছিত করেন, হুমকি দেন।
দপ্তরের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই, এমন ব্যক্তিরাও ঢুকে পড়েন দপ্তরে। অনেকে ভেতরে এসে সিগারেট ধরিয়ে আড্ডা দেন। অথচ এ এলাকায় রয়েছে রেলের গোডাউন যেখানে দাহ্য পদার্থ মজুদ আছে। বহিরাগতদের এমন কর্মকাণ্ডে বড় দুর্ঘটনারও শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া গেটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারও অভাব রয়েছে।
জানা গেছে, দপ্তরের প্রবেশের সময় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা, খাতায় স্বাক্ষর করার নিয়ম থাকলেও সেগুলো কেউ মানেন না।
সম্প্রতি দপ্তরে সরেজমিন দেখা গেছে, দলবেঁধে কয়েক জন যুবক সংরক্ষিত এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে। শামীম নামে তাদের একজনকে ঠিকাদার কি-না, জানতে চাইলে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়েন। তবে প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
অর্ধকোটির মালামাল চুরি
সম্প্রতি সিসিএস দপ্তরের গোডাউন থেকে অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত ২০ জানুয়ারি বিকালে গোডাউনে মালামাল রাখতে গেলে চুরির বিষয়টি ধরা পড়ে। গোডাউনে দেখা যায়, তালা ঠিক, প্যাকেটও ঠিক আছে, কিন্তু প্যাকেটের ভেতর নেই মালামাল। শুধু তাই নয়, ক্যাবল, স্প্রিংসহ রেলের প্রায় অর্ধকোটি টাকার সরঞ্জাম হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর ‘রাজনৈতিক সুবিধা’ নিয়ে একেক জন কর্মচারী দুই থেকে তিনটি করে দপ্তরের দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। একইসঙ্গে এসব চুরির ঘটনা অনেকটা সাজানো। আর চুরি হওয়া এসব মালামালের বাজারমূল্য কমপক্ষে অর্ধকোটি টাকা।
চুরির ঘটনায় শাকিল (২২) ও শাহিন (২৫) নামে দুইজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
নিরাপত্তা ঘাটতি
সিসিএস দপ্তরে তিন শিফটে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ছয় জন। ফলে ছয় জন মিলে বিশাল এলাকা আট ঘণ্টা করে তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছে।
এছাড়া প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব) দপ্তরের চোর প্রবেশের নিরাপদ রুট সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে ও বাইরে দুটি গাছ। রাস্তার পাশে বড় গাছ বেয়ে চোর সীমানাপ্রাচীরের ওপর ওঠে এবং সীমানার ভেতরে আরেকটি গাছ বেয়ে সহজেই নেমে পড়ে। এভাবে মালামালও চুরি করে ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে যায়।
এ গাছ দুটি ব্যবহার করেই চোরের দল প্রায়ই চুরি করছে—এমনটি ধারণা দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের। অথচ চুরি ঠেকাতে কোটি টাকা ব্যয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজ করছে প্রকৌশল দপ্তর।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাস্তা সংলগ্ন সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে একটি গাছ কাত হয়ে আছে। যেটির ওপর দিয়ে অনায়াসে সীমানাপ্রাচীর টপকে যাওয়া যায়। আর সীমানাপ্রাচীরের ওপারে কাত হয়ে আছে আরেকটি বড় গাছ, যেটি বেয়ে সহজেই নামা যায়।
একইসঙ্গে সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা।
দপ্তরে গেটে দায়িত্বরত আরএনবির কনস্টেবল মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বহিরাগত বাঁধা দিলেই দলবল নিয়ে তেড়ে আসে। বাধ্য হয়ে তাদের জন্য পকেট গেট খুলতে হয়।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স অ্যান্ড এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের ঠিকাদার মো. আবু নাইম বলেন, ‘অবাধে বিভিন্ন মানুষ দপ্তরে প্রবেশ করেছে। তারা চাঁদাবাজি, পেশীশক্তির প্রদর্শন, এমনকি এখানকার লোকজনদের শারীরিক লাঞ্ছিতও করছে।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স অ্যান্ড এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, সারাদেশে তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ৮০০ হলেও বর্তমানে সক্রিয় প্রায় ৬৮৫ জনের মতো। তবে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে নিয়ম মানার দিক থেকে এ সংখ্যা ৩০০ এর কাছাকাছি। তাদের আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও বহিরাগতরাদের আনাগোনা বেড়ে চলেছে দপ্তরের এলাকায়।’
তবে নতুন করে সদস্য অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
আরএনবি পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম বলেন, ‘জনবল সংকট চরম, তবুও কর্মকর্তাদের নির্দেশে বহিরাগত বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি লোকবল বাড়িয়ে কঠোর হতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব) মো. বেলাল হোসেন সরকার বহিরাগত প্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ কার্যকর করতে ঠিকাদার, আরএনবির চিফ বরাবরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
ডিজে