s alam cement
আক্রান্ত
৯৯৩৪১
সুস্থ
৭০৯৫৮
মৃত্যু
১২২৭

আনন্দবাজারে ময়লার স্তূপের নিচে চাপা পড়ছে নদীভাঙা শিশুদের রঙিন স্বপ্ন

ময়লা ঘেঁটে সংসার চালায় শিশুরা

0

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এলাকায় কয়েক একর জায়গা জুড়ে পাহাড়সম সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ডিপো। ময়লা নিয়ে গাড়ি আসার সাথে সাথে গাড়ির পিছু পিছু ছুটছে একদল শিশু। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে— কার আগে কে বেশি প্লাস্টিক বোতল কুড়িয়ে বস্তায় ভরতে পারবে। দম বন্ধ হয়ে আসা দুর্গন্ধের মাঝে ময়লা ঘেঁটে প্লাস্টিকের খালি বোতল কুড়িয়ে বস্তায় ভরছে হাসান নামে ১২ বছরের এক শিশু। এটা করতে গিয়ে অসুখ হয়ে যাবে কিনা তার— এ নিয়ে ভাবার সময় নেই তার। কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার ছাড়াই ময়লা ঘেঁটে বোতল কুড়িয়ে বস্তায় ভরে যাচ্ছিল সে। খানিক বাদে সেই ময়লা হাতে খাবারও খাচ্ছিল হাসানসহ তার সঙ্গীরা।

হাসান একা নয়, তার মত আরও কয়েক হাজার শিশুর খাবার জোগাড়ের জন্য একমাত্র আয়ের উৎস এই ময়লার ডিপো। ময়লার ডিপোতে কর্মরত এসব শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ বলতে গেলে কিছুই নেই। ফলে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে এসব শিশুর জীবন।

সরজমিনে ৩০ আগস্ট (সোমবার) সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম নগরীর আনন্দবাজার ময়লার ডিপো এলাকায় কথা হয় আকবর (১১), মিরাজ (১৩), রাব্বি (১৪), শুক্কুর (১২), জিয়া (১০), আরাফাত (৯), রাসেলসহ (১৩) আরও কয়েকজনের সঙ্গে। আলাপকালে তারা জানায়, পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে তাদের কেউই প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ভর্তি হয়নি। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসা এ শিশুগুলোর ভাগ্য বদলে গেছে মুহূর্তেই, পাল্টে গেছে জীবনের চিত্রও।

আনন্দবাজারে ময়লার স্তূপের নিচে চাপা পড়ছে নদীভাঙা শিশুদের রঙিন স্বপ্ন 1

পাহাড়সমান ময়লার স্তুপের নিচে চাপা পড়ে গেছে তাদের আগামী দিনের রঙিন স্বপ্নগুলো আর আলোকিত মানুষ হবার সব আশা-আকাঙ্খা। নদী শুধু তাদের বসতভিটাই ভাঙেনি, ভেঙেছে এইসব শিশুর স্বপ্নগুলোও।

আনন্দবাজার ময়লার ডিপো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ময়লার ডিপো সংলগ্ন টি জি কলোনিতে প্রায় ৩৫০০ পরিবারের ১৫ হাজার মানুষের বসবাস করছে। ওই ১৫ হাজার মানুষের মাঝে বেশিরভাগই নিরক্ষর। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার শিশু। এ শিশুরাও বঞ্চিত সাধারণ শিক্ষা থেকে।

Din Mohammed Convention Hall

জানা যায়, ৩৫০০ পরিবারের মধ্যে অধিকাংশ পরিবার বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা নদীর ভাঙনে তাদের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙা মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে বেঁচে থাকার আশায় জীবন জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রাম শহরে চলে এসেছেন। এখানে রয়েছে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, হাতিয়া, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ। এখন তারা সবাই ভূমিহীন। শহরে এসে ঠাঁই নিলেও নির্দিষ্ট কোনো কাজের সুযোগ নেই তাদের। ফলে তারা নগরের ভাসমান মানুষে পরিণত হয়েছে।

আনন্দবাজারে ময়লার স্তূপের নিচে চাপা পড়ছে নদীভাঙা শিশুদের রঙিন স্বপ্ন 2

এখানকার বাসিন্দা মাসুমা বেগম (৫০) বলেন, ‘ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন এলাকার মলমতোরা গ্রামে আমার জন্ম। স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখের সংসার ছিল। ২০১৫ সালে চোখের সামনে মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে বসতবাড়ি, ফসল, গবাদি পশু, গাছপালাসহ বাপ-দাদা ও আত্বীয় স্বজনের ভিটেমাটি। তছনছ হয়ে যায় আমার মত হাজারও মানুষের কপাল। এখন পরিবারের সবাই মিলে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে সংসার চালাই।’

স্থানীয় সমাজসেবক মো. ইব্রাহীম ফরাজী বলেন, সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। ওরা বেড়ে উঠছে অযত্ন আর অবহেলায়। ওদের স্বাস্থ্যসেবা, লেখাপড়া, কারিগরি শিক্ষা খুবই প্রয়োজন। দিন দিন তারা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অল্প বয়সে জড়িয়ে পড়ছে নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাদকের সাথে।

কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলেন, বিশ্বজুড়ে শিশুদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করণে জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান অন্তরায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় ও খুব বেশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার গরিব পরিবারগুলোকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আরও বেশি দারিদ্র্য ও আবাসচ্যুতির দিকে ধাবিত করছে। ফলশ্রুতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিশুরা ন্যূনতম মৌলিক অধিকার পূরণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বন্দর-ইপিজেড-পতেঙ্গা করোনা হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হোসেন আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা আবর্জনার মাঝে বোতল কুড়ানো শিশুদের চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। শিশুদের প্রতিনিয়ত জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া, কৃমি, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্ট ও চর্ম রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা রয়েছে।

আনন্দবাজারে ময়লার স্তূপের নিচে চাপা পড়ছে নদীভাঙা শিশুদের রঙিন স্বপ্ন 3

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে পৃথিবীর আলোচিত এবং সংকটময় বিষয়গুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সকল দেশকে এগিয়ে আসতে হবে। সম্প্রতি দুই দিনব্যাপী ‘লিডার্স সামিট’ এর উদ্বোধনী সেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪০ জন বিশ্বনেতাদের পরামর্শ দেন কিভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ুর ক্ষতি প্রশমন ও পুনর্বাসনে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার ফান্ড নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া যায়।

তিনি বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজন এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। যা আমাদের জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ৫০টি স্বল্পোন্নত দেশ যারা বিশ্বের ১ শতাংশের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী, তারাই এই নিঃসরণজনিত কারণে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের শিকার হয়। জলবায়ু কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন করে পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ৪ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করেছে।

২০১৯ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিধ্বংসী বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো।

সিপি

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm