ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নাম ভাঙিয়ে ভয়ংকর ডিজিটাল প্রতারণা, সহজ ঋণের টোপে সর্বস্বান্ত মানুষ
আগারগাঁওয়ের ঠিকানায় ক্যালিফোর্নিয়ার নম্বর
চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকায় যখন দুই নারী সহজ ঋণের আশায় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখছিলেন, তখন তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ’-এর নাম ভাঙিয়ে অনলাইনে পাতা হয়েছে এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ ঋণের আশ্বাসে ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এরই মধ্যে বিকাশে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ ডিজিটাল প্রতারক চক্র। চট্টগ্রামেই শুধু নয়, সারা দেশেই এই ফাঁদে পড়ে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে লাখ টাকা খুইয়েছেন আরও অনেকেই।
প্রলোভনের রঙিন হাতছানি
এই প্রতারণার মূলে রয়েছে একগুচ্ছ ভুয়া ওয়েবসাইট, যার ল্যান্ডিং পেইজগুলোতে দেখা যায়, ওপরে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের অফিসিয়াল লোগো। আর নিচের দিকে ‘সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ লোন আপনার দোরগোড়ায়’— এমন বার্তা দিয়ে ‘ঋণের জন্য আবেদন করুন’ ও ‘অ্যাপ ডাউনলোড করুন’ নামের দুটি বাটন আছে। ‘ঋণের জন্য আবেদন করুন’-এ ক্লিক করলে প্রথমে নাম, মোবাইল নাম্বার ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য বলা হয়। এরপর লগইন করার পর ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়। ভিন্ন ভিন্ন নাম ও ডোমেইনে সবগুলো ভুয়া ওয়েবসাইটের ডিজাইন একইরকম। কয়েকটি ওয়েবসাইটের ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের আবছা ছবিও দেখা যায় ব্যাকগ্রাউন্ডে।
সব ভুয়া সাইট ও পেইজের পেছনে একই চক্র
চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে প্রতারকদের এমন অন্তত ১১টি ভুয়া ওয়েবসাইটের খোঁজ মিলেছে। এগুলো হচ্ছে— bdeconomics.net, probashiloan.org, micronfinanceloanbd.com, wbeconomics.org, bdgovernmentfunds.com, bdloan.org, wblb-agent.org, bdworldloanprojectcw.com, wblb-trust.org, woribankbangladesh.com.

এছাড়া ফেসবুকে এই প্রতারকচক্র পরিচালিত বেশকিছু পেইজের খোঁজ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রয়েছে— WB Small Loan BD, SmartAsiaWorldLoan, wblb.smart, bd.economics.rin.abroad, wb.economics.pro, World-Bank-Online-loan-service-61550828581300, facebook.com/profile.php?id=61584474197836.
সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করছে এমন ফেসবুক পেইজের মধ্যে আরও রয়েছে— ফিউচার লেন্ডিং, বোরো বক্স, বোরো বক্স ০০২, গ্রো ট্রাস্ট, বেস্ট কার্ডস ইন বাংলাদেশ, মানি লায়ন, সিআইবিএম লোন অব বাংলাদেশ, বিগ ভুয়া এএ, জেফরি রস, জিনি এ, ম্লাদিলিকোভা২, ডব্লিউবি বিডি সার্ভিসেস, এএসডিসহ আরও নানা পেইজ।
ঋণ নেওয়ার নামে ধাপে ধাপে ফাঁদ
ওয়েবসাইটগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, সর্বোচ্চ ১২০ মাস মেয়াদে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে এবং বাৎসরিক সুদের হার হবে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। চক্রটির চতুর হিসাব অনুযায়ী, ৩০ লাখ টাকার ঋণে ১০ বছর শেষে মোট পরিশোধ করতে হবে মাত্র ৩৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এমন লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়ার পর ওয়েবসাইটের ব্যবহারকারীকে একটি বিশেষ ইন্টারফেসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঋণের মেয়াদ হিসেবে ১২ মাস, ১৮ মাস, ২৪ মাস, ৩৬ মাস, ৪৮ মাস, ৬০ মাস, ৭২ মাস, ৮৪ মাস, ৯৬ মাস, ১০৮ মাস ও সর্বোচ্চ ১২০ মাস পর্যন্ত অপশন দেখানো হয়। এরপর কত টাকা ঋণ নিতে চান, সেটি বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ, ১ লাখ ৫০ হাজার, ২ লাখ, পর্যায়ক্রমে ২০ লাখ, ২৫ লাখ এবং সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত অঙ্ক উল্লেখ থাকে।
পরবর্তী ধাপে ঋণের অর্থ গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে বিকাশ, নগদ অথবা ব্যাংক নির্বাচন করতে বলা হয়। এই ধাপ শেষ করতেই পর্দায় ভেসে ওঠে আরেকটি ইন্টারফেস, যেখানে ইংরেজিতে লেখা থাকে ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শুভ সকাল বা শুভ বিকাল, বিশ্ব ব্যাংক ঋণে আপনাকে স্বাগতম’। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ও ভাষার এই কৌশলী ব্যবহার সাধারণ মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করে এবং প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে ভূমিকা রাখছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পুরো বিষয়টিই একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল প্রতারণা। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ কখনোই এভাবে সরাসরি কোনো ওয়েবসাইট খুলে ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ দেয় না। অথচ এই ভুয়া সাইটটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী দেশের নাগরিকেরা সহজেই বিশ্বাস করে প্রতারণার শিকার হন। দোরগোড়ায় লোন দেওয়ার নামে এ ধরনের লোভনীয় প্রতারণা এখন নেটজগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মানুষের বিশ্বাস ভেঙে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিকাশে টাকা পাঠিয়ে প্রতারিত দুই নারী
চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার রুনা ও মাহবুবা নামের দুই নারী সম্প্রতি এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। bdeconomics.net নামের একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য দেখে বিশ্বাস করে তারা নিবন্ধন করেন এবং ঋণের আশায় ধাপে ধাপে এগিয়ে যান। জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানা, পেশা, ঋণের কারণ, সেলফি ও স্বাক্ষরসহ সব তথ্য আপলোড করার পর একটি পর্যায়ে গিয়ে তাদের কাছ থেকে ঋণ ফি ও সঞ্চয় জমার নামে বিকাশে টাকা পাঠাতে বলা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা ৩৭ মিনিটে ৮ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে নেওয়া হয় ৮ হাজার ১৪৮ টাকা, যার ট্রানজেকশন আইডি ডিএএফ২৫এমআইটিকেআই। একই দিন দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে আরেকটি লেনদেনে নেওয়া হয় ৪ হাজার ৭৪ টাকা, ট্রানজেকশন আইডি ডিএএফ৫৫এম৫১পি৭। দুটি লেনদেনই করা হয় ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর থেকে।
ভুয়া তথ্যেও ‘অনুমোদন’
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভুয়া ওয়েবসাইটগুলোতে ভুয়া নাম, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এমনকি ভিন্ন ব্যক্তির ছবি আপলোড করলেও কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই সিস্টেম তা গ্রহণ করছে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটি একটি সম্পূর্ণ নকল ওয়েবসাইট, যার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
ভুয়া ঠিকানা, রহস্যজনক নম্বর
প্রায় সব ভুয়া ওয়েবসাইটেই যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবে অভিন্নভাবে দেখানো হয়েছে আগারগাঁও, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা। সেখানে বিশ্বব্যাংকের কোনো খুচরা ঋণ শাখা নেই। কার্যকর কোনো মোবাইল নম্বর বা ই-মেইল ঠিকানাও দেওয়া হয়নি। একটি নম্বর দেওয়া আছে +১ ৬৫০-৩১৯-৮৯৩০, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের পালো আল্টো এলাকার কোড।
প্রতারক চক্র বিকাশ এজেন্ট নম্বর হিসেবে ব্যবহার করেছে ০১৯৮৯-০৮১৩৬২ এবং নগদ এজেন্ট নম্বর ০১৯৫৯-৬৬৩৬৬০। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নম্বরগুলোর লোকেশন ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় দেখালেও রেজিস্ট্রেশন তথ্য ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানার। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরকম আরও বেশকিছু বিকাশ ও নগদ নাম্বার ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডোমেইন ও হোস্টিংয়ের আড়াল
ডোমেইন ও হোস্টিং বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই একটি ছাড়া সবগুলো ওয়েবসাইটের ডোমেইনই গত দেড় বছরে বিভিন্ন সময়ে কসমোটাউন ডট ইনক নামে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা। ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময় পর্যন্ত এগুলো রিনিউ করা রয়েছে। সবগুলো সাইটেরই নেইমসার্ভার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ক্লাউডফ্লেয়ারের নেইমসার্ভার, যাতে প্রক্সির মাধ্যমে আইপি মাস্কিং করা। এটি সাধারণত প্রকৃত সার্ভারের অবস্থান গোপন রাখতে সহায়তা করে। ফলে হোস্টিং কোথায় রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি।
পুলিশের সতর্কতা
চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক ফজলে রাব্বি কায়সার জানান, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দেশ-বিদেশে বসে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে এ ধরনের প্রতারণা চালাচ্ছে। তাঁর মতে, লোভনীয় ঋণ বা অফারের ফাঁদে পড়ে বিকাশ বা নগদে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
এদিকে সিএমপি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ইন্সপেক্টর মো. আফতাব হোসেন জানান, অনলাইনে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে প্রতারণা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতাভুক্ত। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তবে অভিযোগ না হলে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে এবং সিআইডিকে নির্দেশ দিলে এই প্রতারক চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হতে পারে।
যা বলছেন সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ
আইটি নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ সানোয়ার হোসেন জানান, বিশ্বব্যাংক বা কোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সাধারণ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ঋণ দেয় না। তার মতে, এ ধরনের সাইটে ঋণ অনুমোদনের আগে টাকা জমা দিতে বলা হলে সেটি নিশ্চিতভাবেই প্রতারণা হিসেবে ধরে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ দেওয়ার আড়ালে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমিত নয় এই প্রতারকদের কার্যক্রম। অ্যাপের মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের মোবাইল ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায় এবং তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য বের করে ব্ল্যাকমেইল করে।
সতর্ক করছে বিশ্বব্যাংক
প্রতারণার এই প্রলোভন থেকে নিরাপদে থাকার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের নাম ও লোগোর অপব্যবহার করে, ফি-এর বিনিময়ে প্রতারকেরা সাধারণ ব্যক্তিকে ঋণ প্রদান/ স্কিম বা বিনিয়োগ কার্যক্রমের ব্যাপারে প্রলোভন দেখানোর ঘটনা ঘটছে। বিশ্বব্যাংকের এই ধরনের কর্মকান্ড বা স্কিমের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তাই অনলাইনে বিশ্বব্যাংকের নামে আসা এইরকম অনুরোধের ব্যাপারে সাবধান ও সতর্ক থাকুন। বিশ্বব্যাংক সরাসরি কাউকে ঋণ প্রদান করে না এবং কোন ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য জিজ্ঞেস করে না।’
বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুষ্কৃতকারীরা বিশ্বব্যাংকের অনুকরণে ফেসবুক পেজ তৈরিসহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থপ্রদানের প্রলোভন দেখাচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির নামে প্রতারণা থেকে সাধারণ জনগণকে সতর্ক করছে বিশ্বব্যাংক।’
জেজে/সিপি



