করোনা তরুণদের ধরছে কম— শুরু থেকে এরকম একটি ধারণা চালু থাকলেও করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে চট্টগ্রামে তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে গেছে অনেক। শুরুর দিকে তরুণরা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের বেশিরভাগই ঘরে থেকেই করোনার মোকাবেলা করেছেন। কিন্তু এবার চিত্রটি বদলে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রচুর তরুণ-তরুণীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। এদের অনেকের ফুসফুসে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে সিটি স্ক্যান রিপোর্টে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও। অন্যদিকে গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও প্রচুর পরিমাণে রোগী করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
এবারের করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে এই দুটি শ্রেণির ওপর করোনার বিস্তারকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ। বিষয়টি তাদের এতোটাই ভাবিয়ে তুলেছে যে, তরুণরা করোনায় আক্রান্ত হলেও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হন না বলে যে ধারণা প্রচলিত ছিল এতোদিন, সেটি থেকে বের হয়ে এসে করোনা হলে প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের অধ্যাপক অলক নন্দী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রথমবার তো করোনায় আক্রান্ত হয়ে তরুণদের সেভাবে হাসপাতালে আসতেই হয়নি। হাতেগোণা দু একজন যা শুরুর দিকে এসেছিল তাদেরও বলার মত তেমন সমস্যা ছিল না। সামান্য ওষুধপত্রে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এবারে প্রচুর তরুণ-তরুণী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অনেকের ফুসফুসে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ইনভলভমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া গর্ভবতী নারীও করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন প্রচুর। মারাও যাচ্ছেন অনেকে।’
চট্টগ্রামে করোনার চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আব্দুর রবও বলেন, ‘করোনার এবারের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণরা হাসপাতালে আসছেন। তাদের অক্সিজেন লাগছে। ফুসফুসে অনেক বেশি সংক্রমণ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।’
হঠাৎ করে করোনার এমন দিকবদলের কারণ কী হতে পারে— এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক অলক নন্দী বলেন, ‘প্রথমত তরুণদের কেউই করোনার ভ্যাকসিন পায়নি। তাছাড়া করোনা তো বারবার চরিত্র বদলেছে। এছাড়া তরুণদের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে করোনায় তরুণদের তেমন ক্ষতি হয় না। ফলে অনেকেই শুরুতে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।’
তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেহেতু তরুণদের করোনায় কাবু হতে দেখা যাচ্ছে, ফলে কোনোভাবেই অবহেলা না করে করোনার উপসর্গ দেখা দিলে সাথে সাথে পরীক্ষা করে প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি তরুণ তরুণীদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনার বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, দেশে বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশই তরুণ-মধ্যবয়সী। তারা বলছেন, দেশে ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এবং সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের কারণেই এমনটি হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ‘করোনাভাইরাসের টার্গেট এবার তরুণ প্রজন্ম। এতদিন দেখা যাচ্ছিল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছিলেন করোনা সংক্রমণে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির কারণ।
এদিকে মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে, চট্টগ্রামে গত ১৬ মাসে ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৫ হাজার ৮৫৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৮৫ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ৫৭৪ জন মহিলা। এই সময়ে এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের, যার ৮ জনই মহিলা।
গত ১৬ মাসে চট্টগ্রামে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৫ হাজার ৭৮৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ হাজার ১৮৭ জন পুরুষ এবং ৫ হাজার ৫৯৯ জন মহিলা। এই সময়ে এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের, যার ১১ জনই মহিলা।
অন্যদিকে ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ১৭ হাজার ৯৫৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০৩ জন পুরুষ এবং ৫ হাজার ৬৫৩ জন মহিলা। এই সময়ে এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের, যার ২৭ জনই মহিলা।
এদিকে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণের বয়সসীমা ৪০ বছর থেকে প্রথমে ৩৫ এবং এরপর ৩০ বছরে নামিয়ে আনার পরও মূলত তরুণদের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সরকার টিকা নেওয়ার বয়সসীমা ১৮ বছরে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
এআরটি/সিপি