চট্টগ্রামে বাড়ছে হামের ভয়, এক সপ্তাহে আক্রান্ত ১৭ শিশু

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম শনাক্ত

চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। এক সপ্তাহে ১৭ জন শিশু হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আক্রান্তদের বয়স ১৫ মাসের কম। তবে এদের মধ্যে অধিকাংশই কক্সবাজার এলাকার বাসিন্দা। প্রায় তিন মাস আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম শনাক্ত হয় হাম। এরপর চট্টগ্রামজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, শিশু হাম আক্রান্ত হলে শরীরে জ্বর থাকবে। সঙ্গে সর্দি, কাশি, গায়ে র‌্যাশ উঠবে। চোখ লাল থাকবে। জ্বরের তিনদিনেই হামের লক্ষণগুলো দেখা যাবে। এ অবস্থায় আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসেব অনুযায়ী, ১৭ জন শিশু হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ২ জন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ৪ জন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১১ জন। এসব রোগীকে শিশু ওয়ার্ডের পৃথক একটি কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতাও জারি করা হয়। চিকিৎসকরা যেসব শিশু টিকার আওতায় পড়েনি তাদের টিক দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে জ্বর, নিউমোনিয়া নিয়ে শিশু রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন।

সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের শিশু রোগ বহির্বিভাগে আগে যেখানে দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ জন শিশু রোগী আসতো, সেখানে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ জন শিশু রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে।

রোববার (২৯ মার্চ) ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে শিশু রোগী ভর্তি ছিল ২২০ জন। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু রোগী জ্বর, নিউমোনিয়া নিয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গু কর্নারটি ‘হাম কর্নার’ করা হয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের সেখানেই রাখা হয়েছে। এখানে ভর্তি হওয়া ১১ শিশুর মধ্যে দু’জনের বয়স ছয় মাসের কম, অন্যদের বয়স সাত থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। ওই কর্নারে অন্য কোনো রোগীকে রাখা হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ধীমান চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাম আক্রান্ত শিশু রোগীদের শরীরে জ্বর থাকবে। সঙ্গে থাকবে সর্দি, কাশি, গায়ে র‌্যাশ। চোখ লাল থাকবে। হাম সাধারনত জ্বরের তিনদিনের মাথায় উঠে। হামের লক্ষন প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে, প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘তবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর হামে আক্রান্ত হলে শিশুর আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু শিশুও ওয়ার্ডের আইসিইউতে হামের শিশুকে রাখা হচ্ছে না। চট্টগ্রাম মেডিকেলে প্রয়োজনে হাম আক্রান্ত শিশুর জন্য আইসিইউর মধ্যে আলাদা জোন করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মুছা মিঞা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাধারণ জ্বরের এ সিজনে হাম আলাদা করে আগে পরীক্ষা করার হয়নি। বর্তমানে হামের লক্ষণ নিয়ে যেসব শিশুকে আমরা আলাদা করছি, তাদের পরীক্ষা করলে হাম শনাক্ত হচ্ছে।’

এদিকে শীতের শেষে ঋতু পরিবর্তনের কারণে ভাইরাল ফিভার থেকে শিশুরা ব্রংকিওলাইটিস ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। প্রথমে জ্বর, সর্দি, কাশি থাকছে। তারপর শুরু হচ্ছে শ্বাসকষ্ট। শিশু খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। আর তখনই আক্রান্ত হচ্ছে নিউমোনিয়ায়। একইসঙ্গে ব্রংকিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুরা শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশিতে ভোগে।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বাসনা মুহুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমান সময়টি যেহেতু গরমের শুরু, শীতের শেষ—তাই ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। আর সেটা থেকে যখন ভাইরাল হচ্ছে তখন ব্যাকটেরিয়া থেকে শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এখন নিউমোনিয়া এত খারাপ অবস্থায় যাওয়ার কারণ, আমাদের শিশুরা পুষ্টিহীনতার শিকার। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাই রোগটি সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়া নিউনোমিয়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে।’

তিনি মায়েদের সতর্ক করে বলেন, ‘বাচ্চার জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখা যাবে না। বাচ্চা যে ঘরে থাকবে, সেই ঘর ধুলোবালি, জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। পাতলা জামা কাপড় পরে রাখতে হবে।’

ডিজে

ksrm