অনিয়মে ভরা একটি বিল দ্রুত ছাড় দেওয়ার অনৈতিক দাবি না মানায় রেলওয়ের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তাকে ঘিরে ‘মব’ তৈরির চেষ্টা ও সশরীরে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক রেল শ্রমিক দল নেতার বিরুদ্ধে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের মাত্র তিন দিনের মাথায় সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দেড়টার দিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদরদপ্তর সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিংয়ে (সিআরবি) অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তার দপ্তরে এই ঘটনা ঘটে। নিজেকে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের সভাপতি দাবি করা ওই কর্মচারীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
দপ্তরে ঢুকে শাসানি
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোমবার অফিস চলাকালে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মিষ্টিমুখ করানোর অজুহাতে সিসিএম দপ্তরের পরিদর্শক পদে কর্মরত শ্রমিক দল নেতা মোমিনুল ইসলাম মামুন অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা মো. সাইদুর রহমান সরকারের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় তার সঙ্গে রেলওয়ে শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোস্তাক আহমেদ, মনিরুল ইসলাম বাবু, তাজুল ইসলাম মিঠু, নাদিম এবং আফতাবসহ অন্তত ১৫ জনের একটি দল ছিল। সাক্ষাতের একপর্যায়ে মামুন শ্রমিকদের ওভারটাইম ভাতার একটি অসঙ্গতিপূর্ণ নথির বিল দ্রুত ছাড়ের দাবি তোলেন। তবে সংশ্লিষ্ট রেল কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, নিয়মের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এই অস্বীকৃতিতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মামুন ও তার অনুসারীরা।
ভিডিওতে হুমকির চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মোমিনুল ইসলাম মামুন ওই কর্মকর্তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। একপর্যায়ে তিনি সাইদুর রহমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি কেন কথা বলেন, আমি আগে কথা বলব। আপনার ব্যবহার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চাইতেও বেশি। আপনি বললেন একটা চিঠি আসছে, আমি কেউ না। এই কথাটা আজকের দিনে আপনার বড় অপরাধ। এইটা আপনার সবচেয়ে বড় অপরাধ। এর জন্য আপনাকে পানিশমেন্ট পেতে হবে।’ এ সময় ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় শাসাতে দেখা যায় তাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাইদুর রহমান সরকার এ সময় জানান, জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক এমআর মনজুর। তাছাড়া রেলওয়েতে উক্ত ফেডারেশনের এফিলিয়েটেড অন্য কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই।
এমন কথা শুনে মামুন তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এর একপর্যায়ে টেবিল চাপড়ে উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকেন তিনি ও তার সঙ্গীরা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষোভ
সরকারি দপ্তরে অফিস চলাকালে দলীয় পরিচয়ে প্রবেশ করে এভাবে চাপ সৃষ্টি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে শাস্তির হুমকি দেওয়ার ঘটনায় রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ রক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছিল আগেও
গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ভুয়া বিল-ভাউচারে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। ঘটনাটি ঘটেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তার দফতর (এফএঅ্যান্ডসিএও) কার্যালয় থেকে ওই টাকা রেলওয়ের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা মো. সাইদুর রহমান সরকার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, গত ৭ ফেব্রুয়ারি বাজেট ও খরচের হিসাব রিকনসিলেয়েশনের সময় দেখা যায়, গত ২৮ ডিসেম্বর মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন ঢাকার নামে তাদের চারটি বিলের অতিরিক্ত ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি সন্দেহজনক বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যা গুরুতর আর্থিক অনিয়মের পর্যায়ভুক্ত। উক্ত বিল পাস ও চেকের মাধ্যমে পরিশোধের সঙ্গে নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
সাময়িক বহিষ্কার হওয়া সাত কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব কর্মকর্তা মামুন হোসেন, হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের, হিসাবরক্ষক শিমুল বেগম, হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমান, অডিটর ডিএফএ পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর ইকবাল মো. রেজাউল করিম ও অফিস সহায়ক মাকসুদুর রহমান।
জানা গেছে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কসমোপলিটন করপোরেশনের সঙ্গে বেশ কিছু চুক্তির মাধ্যমে মালামাল ক্রয় করা হয়। এর মধ্যে চারটি কাজের বিল বাবদ তিন কোটি ৬২ লাখ টাকা কসমোপলিটনকে পরিশোধের জন্য হিসাব বিভাগকে চিঠি দেন প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ফরিদ উদ্দীন। ওই টাকা তুলে নেওয়ার পরপর বিস্ময়করভাবে আরও ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির নামে।
সিপি



