চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের পর এবার কাজীর দেউড়ির জুয়ার আসরে পুলিশের হানা
ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের পর এবার নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি জুয়ার আসর গুঁড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ ২০ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসার তিন দিনের মাথায় লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকের একটি ফেসবুক পোস্টের জের ধরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বেইজমেন্টে চলা কথিত সাংবাদিকদের জুয়ার আসর বন্ধ করে দিয়েছিল পুলিশ। প্রায় ১৬ মাস ধরে রমরমা হাউজি ও জুয়ার বোর্ড চালিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ ওঠার পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে সেখানে অভিযান চালানো হয়।

এদিকে রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে কোতোয়ালী থানার কাজীর দেউড়ি কাজী পাড়ার কাজী বাড়ি পুকুরপাড় এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আরও একটি জুয়ার আসর গুঁড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন জানান, প্রকাশ্যে জুয়া খেলার সময় ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে নগদ ১২ হাজার ২৯০ টাকা এবং তিনটি তাসের বান্ডেলে মোট ১৫৬টি তাস জব্দ করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন জালাল, কামাল, সজিব, আপন, আলমগীর, সহিদ, মোবারক, আকতার, নুর মোহাম্মদ, শরীফ, সেলিম, আবুল কালাম, মনির, বেলাল, সুমন, সাজন, জামাল, সাহেদ ও সাদ্দামসহ মোট ২০ জন।
ওসি আফতাব জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৯৪/১০৩ ধারায় মামলা দায়ের (মামলা নম্বর-৬৫/২০২৬) করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্ট থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর
এদিকে প্রায় ১৬ মাস ধরে রমরমা হাউজি ও জুয়ার বোর্ড চালিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ ওঠার পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের জুয়ার আসর বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জুলকারনাইন সায়ের পবিত্র রমজানে প্রেসক্লাবে জুয়া ও হাউজির আসর নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানা গেছে। এরপরই উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে অভিযান পরিচালিত হয়।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজের নির্দেশে কোতোয়ালী থানার একদল পুলিশ গিয়ে আসরটি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বিকেলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জুয়ার আসর বন্ধের নির্দেশ সিএমপি কমিশনারের কাছে পৌঁছায়। এরপর তিনি কোতোয়ালী থানার ওসিকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং সন্ধ্যার পর থেকে প্রেসক্লাবের সামনে বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেন।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন জানান, গত শনিবার থেকে প্রেসক্লাবের সামনে বিশেষ পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জুয়ার আসর অন্য কোথাও সরিয়ে বসানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও নজরদারি রাখা হচ্ছে।
১৬ মাসের দখল ও জুয়ার কারবার
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় ১৬ মাস আগে একদল দুর্বৃত্ত তিন দফা হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দখল করে নেয়। এরপর সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও ধর্ষণ মামলার আসামিদেরও ক্লাবে আনাগোনা শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বেইজমেন্টে সপ্তাহে পাঁচ দিন জুয়া ও হাউজির আসর বসত। প্রতি রাতে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার লেনদেন হতো, যার মধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা কয়েকজন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি ভাগ করে নিতেন। গত ১৬ মাসে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা লুটপাট হয়েছে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপি–জামায়াতপন্থী দাবি করা কিছু সাংবাদিক প্রেসক্লাবের দখল নেন। দখলদার কমিটি সপ্তাহে পাঁচ দিন জুয়ার বোর্ড পরিচালনা করত। আগে ১০০ টাকার বোর্ডে বিজয়ীকে ২০ হাজার টাকা এবং ৫০০ টাকার বোর্ডে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হতো। সম্প্রতি তা কমিয়ে যথাক্রমে ১৭ হাজার ও ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে জুয়াড়িদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপস্থিত হন আমার দেশ পত্রিকার আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি, কালের কণ্ঠ পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান মুস্তফা নঈম এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, তারা জুয়াড়িদের উদ্দেশে বলেন, ক্লাবের ৪০০ সাংবাদিক ছাড়াও ডিসি, এডিসি ও এনডিসি কমিশন পান, তাই নির্ধারিত টাকার বেশি দেওয়া সম্ভব নয়। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘প্রেস ক্লাব যেভাবে দখল হয়ে বসে আছে। চিটাগাং প্রেস ক্লাবের ইস্যু আমি গত এক বছরে সলভ করতে পারিনি। বিকজ অফ দ্য পলিটিক্যাল পার্টিজ ইনভলভমেন্ট দেয়ার। ওখানে পলিটিক্যাল পার্টি, এবং ওখানে জুয়া চলে, ওখানে আরও কী কী চলে। আমি ওগুলো ডিসিকে বলে বন্ধ করতে পারছি কিছুটা। কিন্তু এই যে প্রেসক্লাবের ইস্যুটা ওখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে এটা এখনও… একটা নির্বাচন হয়নি। এক বছরে একটা নির্বাচন হয়নি, প্রেসক্লাবে, চিটাগাং প্রেসক্লাবে। সো, দিস ইজ দ্য রিয়েলিটি…’



