সরকার-নির্ধারিত ফি জমা দিয়েও ঠিক সময়ে মিলছে না সাধারণ বা ইমারজেন্সি পাসপোর্ট। চট্টগ্রামের বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে পাসপোর্ট করাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। আইন মেনে কাজ করতে গিয়ে সেবা না মিললেও দালালদের শরণাপন্ন হলে ঠিক সময়ে ঠিকই মিলছে সেবা।
বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, দালালদের শরণাপন্ন না হয়ে সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পাসপোর্টের কাগজপত্র জমা দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অফিসে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাগজপত্রে ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হলে কাগজপত্র নিয়ে অফিস থেকে বের করে দেয়। দালালদের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিতে ইচ্ছে করেই পরিস্থিতি জটিল করে রাখা হয়েছে কিনা তা তদন্ত করে দেখা দরকার।
পাসপোর্ট অফিসে দালালদের সংঘবদ্ধ একটি চক্র রয়েছে। ওই দালালদের দিয়ে করলে সবকিছু ঠিকঠাকমতো হয়ে যায়। এমনকি পুলিশ ভেরিফিকেশনেও আসে না। সাধারণ মানুষ পাসপোর্ট অফিসে আসলে দালাল ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে পদে পদে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হতে হয়।
৪০ থেকে ৪৫ জনের দালালচক্র
চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস ঘিরে ৪০ থেকে ৪৫ জনের সংঘবদ্ধ একটি দালালচক্র রয়েছে। ওই দালালদের মারফতে সব কিছু হয়। এখন দালালরা আগের মতো পাসপোর্ট অফিসে অবস্থান না করলেও বাইরে থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে সবকিছু লেনদেন করে।
দালালদের মাধ্যমে করলে অফিসে কোনো ধরনের সমস্যা মুখোমুখি হতে হয় না সেবাগ্রহীতাদের। আর দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট না করলে নানান ভুলভ্রান্তি দেখিয়ে মাসের পর মাস ঘুরাতে থাকে। দালালদের সরকারি নির্ধারিত ফি’র সাথে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বেশি দিলে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পাসপোর্ট হাতে এনে দিচ্ছে।
সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের একটি ভাগ পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে চলে যায়। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে— চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা মাসের পর মাস ঘুরে দালালদের শরণাপন্ন না হয়ে কাগজপত্র জমা দিতে পারলেও দ্রুত পাসপোর্ট ডেলিভারি পেতে প্রত্যেক সেবাগ্রহীতাকে ২ হাজার ১ শ’ টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হয়। টোকেন না নিলে পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতায় আটকে যাচ্ছে পাসপোর্ট।
ভুক্তভোগিদের অভিযোগ
কাউসার নামে এক ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘নির্ধারিত ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে কাগজপত্র জমা দিতে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র জমা দিতে গেলে ওয়ার্ডের জায়গায় ইউনিয়নের নাম লিখাতে কাগজপত্র দিয়ে দেয়। ঠিক করে আসতে বলে। আর তারা ঠিক করে দিলে আমার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করে। আমি টাকা না দিয়ে কাগজপত্র নিয়ে চলে আসি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে দালাল ছাড়া ভোগান্তির শেষ নেই। টাকা দিয়ে দালাল ধরে করলে ভুলভ্রান্তি থাকলেও সমস্যা হয় না। দালাল ছাড়া করলে সব সমস্যা বের হয়ে আসে। আসলে এসব দেখার কেউ নেই।’
সাইফুদ্দিন নামে আরেক ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি করোনার আগে দেশে সফরে আসি। আসার পর হঠাৎ করোনা শুরু হওয়াতে আর যেতে পারিনি। এর মধ্যে আমার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। বিদেশে চলে যাওয়ার সময় কাছে চলে আসাতে ইমারজেন্সি ফি দিয়ে পাসপোর্ট রিনিউ করতে দিয়েছিলাম। নির্ধারিত সময়ের পর পাসপোর্ট আনতে গেলে ঢাকা অফিস থেকে আসে নাই বলে। আমার ফ্লাইট কাছে চলে আসাতে পাসপোর্টটি দ্রুত পেতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদের কাছে সহযোগিতা চাইতে যায়। তখন তিনি বলেন আপনার আগে যারা দিছে তারা এখনো পায়নি। আপনি তাদের পর দিয়ে আগে পাওয়ার আশা কিভাবে করেন। আমি তার কাছে হাত জোর করে অনুরোধ করার পরও তিনি কোনো ধরণের সহযোগিতা রাজি হননি।’
বিলম্বের শিকার জনপ্রতিনিধিও
২নং জালালাবাদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ভুক্তভোগী মো. শাহেদ ইকবাল বাবু চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি প্রতি বছর রমজানে ওমরাহ করতে যায়। এই বছরও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু আমার এনআইডি কার্ডে আছে শাহেদ ইকবাল বাবু আর পাসপোর্টে আছে শাহেদ ইকবাল। পাসপোর্টেও নামের সাথে বাবুটা যুক্ত করার জন্য ইমারজেন্সি ফি দিয়ে সংশোধন করতে দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে আজ ১ মাস ১০ দিন হয়ে গেলেও এখনো পাসপোর্ট পেলাম না। নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট না দিলে ইমারজেন্সি ফি দিয়ে করতে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। সাধারণ ফি দিয়ে করতে পারতাম।’
দুঃখ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে এভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি। সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হবে চিন্তা করে দেখেন। তারা মানুষের সাথে সেবার নামে প্রতারণা করতেছে। এভাবে তো প্রতারণা করা যায় না।’
‘স্যার ছুটিতে’
এবিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মো.আবু সাইদের মুঠোফোনে একাধিক বার কল করার পর রিসিভ না করলে টেক্সট পাঠানো হয়। টেক্সট পাঠানোর কিছুক্ষণ পর একজন মহিলা কল ব্যাক করে জানান, স্যার ছুটিতে ঢাকায় আছে। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’
কেএস