লাইলাতুল কদরের অপেক্ষায় রহমতের প্রথম দশ দিন

রমজান এলেই বদলে যায় মুসলমানের দিনযাপন, খোলে জান্নাতের দরজা, বন্ধ হয়ে যায় জাহান্নামের দ্বার, শৃঙ্খলিত হয় শয়তান। হাদিসে বর্ণিত এই ঘোষণা ঘিরেই শুরু হয় পবিত্র মাহে রমজান, যার প্রথম দশ দিনকে বলা হয়েছে রহমতের সময়। এ সময় আল্লাহতায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ বান্দাদের ওপর বিশেষভাবে বর্ষিত হয়।

রমজানুল মোবারককে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ১০ দিন রহমতের, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের এবং শেষ ১০ দিন নাজাতের। সাধারণভাবে বলা হয়, প্রথম দশকে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, দ্বিতীয় দশকে ক্ষমা করেন এবং শেষ দশকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এই বিন্যাস রমজানকে দিয়েছে আলাদা তাৎপর্য।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমাদান মাস আসে, তখন বেহেশতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, দোজখের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।’ রমজান শব্দের অর্থ দহন করা। এ মাস মুসলমানদের পাপ-পঙ্কিলতা দগ্ধ করে পবিত্রতার পথে আহ্বান জানায়।

রোজা ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম। মহান রাব্বুল আলামিন রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন। অন্যান্য ফরজ ইবাদতের মতোই রোজা পালন একজন মুসলমানের জন্য আবশ্যক। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।’

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, ‘সিয়াম এবং কোরআন হাশরের ময়দানে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহতায়ালা উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন।’ আরেক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক বস্তুর জাকাত রয়েছে, শরীরেরও জাকাত আছে, আর শরীরের জাকাত হলো রোজা।’ আরও বর্ণিত আছে, মানুষের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। বান্দা আমার সন্তুষ্টির জন্য তার পানাহার ও কামনা-বাসনা ত্যাগ করেছে।’

পবিত্র রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল-কোরআন, মানুষের জন্য হিদায়াত এবং পথনির্দেশনার স্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস, আর সিয়াম সেই পথে একটি অনন্য সোপান।

হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, এর একটি দরজার নাম রাইয়ান। এ দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররা প্রবেশ করবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে—একটি ইফতারের সময়, অন্যটি আল্লাহর সাক্ষাতের সময়।’ হাদিসে উল্লেখ আছে, ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। এ সময় পড়া যায়, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিরাহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়িন আনতাগফিরা লিজুনুবি।’

রমজানের বিশেষ ইবাদত তারাবিহ। এশার ফরজ ও সুন্নতের পর বিতরের আগে দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত। সম্ভব হলে খতম তারাবি আদায় করা উত্তম। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে তারাবিহ নামাজ পড়বে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ তারাবিহর অন্যতম উদ্দেশ্য কোরআন তিলাওয়াত করা ও শোনা।

রমজানের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর। কোরআনে উল্লেখ আছে, এ রাত এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এক হাজার মাস হিসাব করলে তা ৮৬ বছর ৪ মাসের সমান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাতে সওয়াবের আশায় ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) জানতে চাইলে নবী করিম (সা.) দোয়া শিখিয়েছেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফুআন্নি।’ হাদিসে আছে, রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিতে শবে কদর তালাশ করতে হবে।

ইতিকাফ রমজানের শেষ দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ওয়া আনতুম আকিফুনা ফিল মাসজিদ।’ ইতিকাফের অর্থ নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় পুরুষেরা মসজিদে এবং নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেন। ২০ রমজানের সূর্যাস্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। প্রয়োজন ছাড়া ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা যাবে না।

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। সদকাতুল ফিতর এ মাসেই আদায় করতে হয়, যাতে অভাবী মানুষ ঈদ আনন্দে অংশ নিতে পারেন। ঈদের নামাজের আগে এ সদকা প্রদান করা উচিত। সাহাবায়ে কেরাম ঈদের কয়েক দিন আগে তা পৌঁছে দিতেন, যাতে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা যায়।

প্রথম দশকে কোরআনে বর্ণিত একটি দোয়া বেশি পড়া যেতে পারে, ‘ওয়া কুর রব্বিগফির ওয়ার হাম ওয়া আনতা খইরুর রহিমিন।’ অর্থ, ‘হে আমার রব, ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা মুমিনুন : ১১৮)।

রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। সংযম, সহনশীলতা ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে এ মাস কাটানোই একজন মুমিনের কাম্য। আল্লাহতায়ালা আমাদের রমজানের রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন। ইয়া রাব্বুল আলামিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm