হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার

পতেঙ্গায় এগ্রো ফার্মে ঝুঁকছে তরুণ উদ্যোক্তারা

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা আবুল কালাম। পেশায় একজন পানি বিক্রেতা। শখের বশে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় হাঁস ও মুরগি পালনের জন্য অন্যের পরিত্যক্ত একটি ডোবা ও কিছু জায়গা মাসে ৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া নেন তিনি। শুরুতে ১৫০ জোড়া হাঁস ও ৫০ জোড়া দেশি মুরগির বাচ্চা কিনেন। খরচ পড়ে ৯০ হাজার টাকা। ধীরে ধীরে এক বছরে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা তিন শতাধিক এবং মুরগি দুই শতাধিকে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন হাঁস থেকে ১৬৩টি ও মুরগি থেকে ৪০টির মতো ডিম পেতে তিনি। হাঁসের ডিম প্রতিটি ১৭ টাকা ও মুরগির ১৬ টাকায় বিক্রি করতেন। এতে দৈনিক প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় আয় হতো তার। শুধুমাত্র ডিম বিক্রি করেই তিনি পুঁজি তুলে ফেলেন।

হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার 1

এর মধ্যে হঠাৎ অজানা রোগে হাঁসগুলোর ঘাড় বাঁকা হয়ে দুইদিনে মারা যাওয়া শুরু করে। এভাবে এক সপ্তাহে ৪০টিরও বেশি হাঁস মারা যায়। এরপর উপায় না দেখে অবশিষ্ট হাঁসগুলো জোড়া ১২০০ টাকায় বিক্রি করে দেন তিনি। সেখানেও তার ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা লাভ হয়। আর ৮০০ টাকা কেজিতে দেশি মুরগি বিক্রি করেন। ৫০টি মুরগি থেকে তার লাভ হয় ৪০ হাজার টাকা।

আবুল কালাম বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের ঝামেলা ও জায়গার সংকট থাকার কারণে বড় পরিসরে হাঁস-মুরগি পালন করতে গিয়ে নানান সমস্যায় পড়তে হয়। তবে যে কেউ পর্যাপ্ত পরিমাণ খোলামেলা পুকুরসহ জায়গা পেলে, সেখানে খামার গড়ে হাঁস-মুরগি পালন করতে পারবেন। আর এতে বছরে বেশ ভালোই লাভবানও হবেন।’

আবুল কালামের মতো বহু তরুণ উদ্যোক্তা এখন পোল্ট্রি খামার, কৃষি ও মাছ চাষে ঝুঁকছে। সমুদ্র উপকূলঘেঁষা পতেঙ্গায় সবজি চাষাবাদের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন এগ্রো ফার্ম। তরুণ উদ্যোক্তাদের অনেকে এখন গরু-ছাগল পালন থেকে শুরু করে হাঁস-মুরগির পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তুলেছেন। সমুদ্র সংলগ্ন পতেঙ্গা, ইপিজেড, বন্দর ও হালিশহরের বিভিন্ন এলাকায় তিন দশক আগেও ধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন মৌসুমে সবজির বেশ ফলন হতো। যা পুরো নগরের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি জমি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেকটা প্রতিকূল পরিবেশে ফসল উৎপাদন করতে হচ্ছে এখানকার কৃষকদের। তবে আশা আলো দেখাচ্ছে এখানকার নতুন এগ্রো উদ্যোক্তারা।

তবে এসব এগ্রো ফার্মের উদ্যোক্তাদেরও বিভিন্ন ধরনের দুর্ভোগ পোহাত হচ্ছে। তারা কোনো ধরনের বীমা সুবিধা তো পাচ্ছেনই না বরং পশু খামারকে কৃষি খাতের বাইরে রাখায় বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি বোঝা টানতে হচ্ছে তাদের।

সরেজমিন এসব এলাকায় খোঁজ নিয়ে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন কন্টেইনার ডিপো, সরকারি, বেসরকারি স্থাপনার জন্য এখানকার কৃষি জমি অধিগ্রহণসহ দখল-দূষণে তলানিতে এসে ঠেকেছে কৃষিখাত। এছাড়া লবণাক্ততা, ডিপ সেচ না থাকা, ঋণের সুবিধা না থাকা, সরকারি নজরদারির ও কৃষি অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা কারণে তরুণ উদ্যোক্তাদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি খামার বন্ধও হয়ে গেছে।

বন্দর-পতেঙ্গা-হালিশহর এলাকায় জিইএম কলোনি; পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওয়েল কোম্পানি, ইস্টার্ন রিফাইনারি, বাংলাদেশ নেভি, বিমান বাহিনী, রেলওয়ে, ডিসি পার্কসহ সরকারি পরিত্যক্ত জায়গা লিজ নিয়ে অনেকে মাছের চাষ শুরু করেছেন।

হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার 2

মাছ চাষে বছরে ২৭ লাখ লাভ

চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গার বাসিন্দা সার বিক্রেতা মহিবুল্লাহ শেয়ারে প্রায় ২০ লাখ টাকায় তিন বছরের জন্য ছয়টি পুকুর লিজ নেন। পুকুরগুলোতে মাছের জন্য খাদ্য হিসেবে দেড় মাসে ১৩ টন ফিড লাগে, যার বাজারমূল্য ৭ লাখ টাকা। এক বস্তা ফিডের দাম পড়ে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা। ফিডের দাম বেশি হওয়ার কারণে অনেক সময় মাছের খাদ্যের যোগান দিতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। তখন বিকল্প হিসেবে ইপিজেডের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকদের খাবারের উচ্ছিষ্ট মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমন অবস্থার মধ্যেও গত বছর প্রায় ২৭ লাখ টাকা লাভ করেছেন তিনি।

মহিবুল্লাহ বলেন, বড় সাইজের পোনা সংগ্রহ করে চাষ করলে বছরে দু’বার মাছ বিক্রি করা যায়। আমাদের পুকুরে দেড় কেজি থেকে পাঁচ কেজি ওজনের পাঙ্গাস রয়েছে। আমরা প্রতিকেজি মাছ ১১৭ টাকা করে বাজারে পাইকারি বিক্রি করি। মাছের চাষ করে এ পর্যন্ত আমাদের কোনো লোকসান গুনতে হয়নি। তবে আবহাওয়া ও ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছ মারা যায়। একইসঙ্গে বর্ষাকাল বানের জলে ভেসে যায় পুকুরের মাছ। পুঁজি ও জায়গা থাকলে মাছের চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।

গরু-ছাগলের খামারে সফল নুরুল

পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন নুরুল ইসলাম। কিন্তু করোনাকালে চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে যান তিনি। তারপর শখ করে মাত্র ১টি ছা শুরু করেন খামার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বর্তমানে তার খামারে হরিয়ানা, তোতাপুরী, বিটল জাতের ৬০টি ছাগল রয়েছে। একইসঙ্গে গরুর খামারও করেছেন তিনি। রয়েছে ১৩টি দেশীয় গরু।

তিনি বলেন, ‘পুঁজি দিলে রুজি বাড়ে। আমি একজোড়া ছাগল ছানা বিক্রি করি ৩০ হাজার টাকায়। প্রতি মাসে ছাগলের পেছনে ওষুধের খরচ যায় ৩ হাজার টাকা। বেশির ভাগ সময়ে খামারের ছাগল ঠাণ্ডা-সর্দি ও কৃমিতে আক্রান্ত হয়। এজন্য ৯০ দিন পর পর ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি পিপিআর রোগের জন্য চার মাস পরপর টিকা দিই। ইউটিউব ভিডিও দেখে এবং পশু ডাক্তারদের কাছ থেকে আমি গবাদি পশু প্রাথমিক চিকিৎসা রপ্ত করেছি।

বর্তমানে বছরের ৫ থেকে ৭টি পাঁঠা ছাগল বিক্রি করে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ করেন তিনি। ব্যাংক ঋণ নিলে নানান ঝামেলায় পড়তে হয়, তাই চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে খামার পরিচালনা করছেন বলে জানান নুরুল ইসলাম।

হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার 3

দিনে ২২০০ লিটার দুধ মেলে আঞ্জুমান ডেইরিতে

চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী মোল্লা ডেইরি ফার্মের উত্তরসূরিদের একজন মো. হানিফ। পারিবারিক ঐতিহ্য তিনি ধরে রেখেছেন। তাদের ডেইরি ফার্মের দুধ এলাকার চাহিদা পূরণ করে যায় আশপাশের দোকানেও।

আঞ্জুমান ডেইরি এগ্রোর মালিক মো. হানিফ বলেন, ‘চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী মোল্লা ডেইরি ফার্ম ছিল আমাদের পারিবারিক পশু খামার। বর্তমানে আমাদের চার ভাইয়ের মধ্যে তিনজনের রয়েছে আলাদা আলাদা এগ্রো এবং একজনের পোল্ট্রি খামার। আমাদের তিন ভাইয়ের এগ্রোতে প্রায় ৩০০টি গরু রয়েছে। এসব গরু থেকে দৈনিক ২২০০ লিটার দুধ পাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে ৩০০ লিটার দুধ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। বাকি দুধ আমরা বড় বড় মিষ্টির বেকারিতে বিক্রি করি।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দফায় দফায় গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরিও অনেক বেড়েছে। সমস্যার মধ্যেই এখনও টিকে আছি, কিন্তু কতদিন যে টিকতে পারব—সেটাই এখন প্রশ্ন। দৈনিক ৩০০টি গরুর জন্য প্রতিকেজি ৫ টাকা করে ৩০ টন কাঁচা ঘাস লাগে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কৃষি খাতকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দেখানো হয়। ফলে ১৫ টাকা ইউনিট বিল দিতে হয় আমাদের। আজ পর্যন্ত কৃষি অধিদপ্তর থেকে কেউ কোনোদিন খোঁজ-খবর নেয়নি। সরকারি যদি গো-খাদ্যে ৬০ শতাংশের জায়গায় ৪০ শতাংশ করে এবং দুধের দাম কিছুটা বাড়ায়, তাহলে দুধ বিক্রি করে খামারিরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত কোরবানির ঈদে আমাদের প্রায় ২০০টি গরু বিক্রি হয়েছে। আসলে কোরবানির পর থেকে ৪ মাস আমরা পশু খামারিরা লাভের মুখ দেখি।’

ফিড নিয়ে বিপাকে খামারিরা

আবুল কালামের মতো আরেক পোল্ট্রি ব্যবসায়ী ম্যাক এগ্রোর মালিক মো. মোক্তার হোসেন। তার তিনটি পোল্ট্রি খামারে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার লেয়ার মুরগি। দৈনিক ৬ হাজার ডিম পাওয়া যায় খামার থেকে। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সঙ্গে মিল রেখে ডিমের দাম নির্ধারণ করেন তিনি। মুরগির খাবারের জন্য দৈনিক ১১ বস্তা ফিড লাগে তার, খরচ যায় ৩১ হাজার টাকা। মুরগির ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার কারণে প্রতি মাসে ওষুধ খরচ লাগে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা। সঙ্গে ১২ জন কর্মচারীর বেতন ও বিদ্যুৎ বিলের খরচ তো রয়েছেই। বয়স বাড়লে সব লেয়ার মুরগি একসঙ্গে বিক্রি করেদেন তিনি। বর্তমান তার পোল্ট্রি খামারে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকার মুরগি রয়েছে। এছাড়া ডিম বিক্রি করে, খরচ বাদ দিয়ে তার দৈনিক ৫ হাজার টাকা লাভ হয়।

তিনি বলেন, ‘দিন দিন যেভাবে মুরগির ফিডের দাম বাড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে পোল্ট্রি খাতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। কৃষি খাতে সরকারি নজরদারি খুবই প্রয়োজন। পোল্ট্রি খামারিরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা পেলে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।’

এদিকে পোল্ট্রি পেশাজীবী পরিষদের সাবেক সহ-সভাপতি খন্দকার মুনির আহমেদ বলেন, ‘দেশের পোল্ট্রি খামারি, উদ্যোক্তা, ফিড ও মেডিসিন ব্যবসায়ী এবং ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের নিয়েই আমাদের কার্যক্রম। আমাদের লক্ষ্য—টেকসই, আধুনিক ও নিরাপদ পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তোলা। দেশে পোল্ট্রি খামার থেকে ২০২৪-২৫ সালে দুই হাজার ৪৪০ কোটি পিসেরও বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিমের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়। হাঁস থেকে বছরে প্রায় ৪৫০-৫০০ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। দেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে পোল্ট্রি খাত থেকে।’

হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার 4

টমেটোর ভালো ফলন, তবুও চিন্তায় কৃষক

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পতেঙ্গা থেকে হালিশহর ও ফৌজদারহাট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাজুড়ে টমেটোর চাষ করা হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলছে কাঁচা-পাকা টমেটো। এরই মধ্যে গাছ থেকে পাকা টমেটো তুলে আনা ও সাজিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত কৃষক। ফাঁকে ফাঁকে চলছে বিক্রিও। বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকারদের অনেকেই টমেটো কিনতে এসেছেন এখানে। ফলন ভালো হলেও সারের অপ্রতুলতা, সরকারি সুবিধাবঞ্চিত হওয়া, বিষাক্ত বর্জ্য ও পানির সংকট কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজে ফেলেছে।

এ সময় কথা হয় টমেটো চাষী আবদুর রহিমের সঙ্গে। ২০২১ সালে করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েন পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ সোলাইমান কন্ট্রাটরের খামার বাড়ির এই মৌসুমে সবজি চাষী। তখন ৫ বিঘা জমিতে টমেটো চাষের জন্য সুদে ৫ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কৃষি কাজে খরচ বেড়ে যাওয়া, প্রতিকূল আবহাওয়া আর পচন রোগের কারণে ফলন কম হচ্ছে। এতে দিশেহারা আবদুর রহিমের কপালে চিন্তার ভাঁজ, কিভাবে ঋণের টাকা শোধ করবেন?

আবদুর রহিম বলেন, ‘সরকার ১ বিঘা জমিতে ৪০ কেজি সার নির্ধারণ করছে। কিন্তু এখানকার মাটি লবণাক্ত হওয়ায় ১ বিঘা জমিতে লাগে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি কালো সার। একইসঙ্গে সেচের পানি না থাকায় খালের নোংরা পানিতে মেশাতে হয় ২০ থেকে ৩০ কেজি সাদা সার, তা নাহলে ফসল ফলে না। এখানকার কৃষকরা নানান সমস্যায় জর্জরিত। মাঠে-ঘাটে খেটে খাওয়া প্রান্তিক কৃষকদের খোঁজও নিচ্ছে না কৃষি বিভাগ।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ১৭ বছরের মধ্যে কৃষি বিভাগ থেকে উন্নত জাতের বীজ, সার ও কীটনাশক ওষুধ আজও পর্যন্ত পাইনি। আমরা বর্গাচাষীরা অন্যের জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করি, তাই কৃষি ঋণ নিতে নানান ঝামেলায় পড়তে হয় আমাদের। শুনেছি, সরকার কৃষকদের জন্য প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কই, আমাদের ভাগ্যে তো কখনও কিছুই জুটেনি। সময় মত ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে রাতের অন্ধকারে পরিবার নিয়ে পালিয়ে বাঁচা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।’

বন্দর থানার আনন্দবাজার এলাকার সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ডিপো সংলগ্ন ২০ কানি জমিতে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে টমেটোর চাষ করেছেন রফিকুল ইসলাম। গত বছর তিনি দৈনিক আড়াই টন করে টমেটো বিক্রি করেছেন। এ বছর বৃষ্টি আর খরার কারণে ফসল উৎপাদন একটু কম হওয়ার কারণে তিনদিন পর পর ৮০ থেকে ১০০ টাকায় এক টন করে টমেটো বিক্রি করছেন তিনি।

বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে সর্বনাশ

হালিশহর, বন্দর, ইপিজেড ও পতেঙ্গা এলাকায় বেশিরভাগ আবাদি জমির আশপাশে পুকুর, গভীর নলকূপ ও জলাধার নেই। তাই বাধ্য হয়ে এখানকার কৃষকেরা কলকারখানার বর্জ্যমিশ্রিত নালা-নর্দমার এসব নোংরা পানি ব্যবহার করছেন চাষের কাজে।

সরেজমিন দেখা গেছে, কৃষকরা চাষের জমির পাশেই খাল, ড্রেন ও খালের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া কূপ থেকেই মোটরের মাধ্যমে পানি দেওয়া হচ্ছে সবজির খেতগুলোতে।

মো. মোনাফ নামে এক কৃষক জানান, ‘৯ বিঘা জমিতে ফসল চাষ করেছি এখানকার জমির মাটিতে লবণাক্ততা বেশি, খালের বর্জ্যমিশ্রিত নোংরা পানি দিয়ে চাষাবাদ করতে কষ্ট হয়। এখানে পানি সেচের কোনো ব্যবস্থা নেই, বৃষ্টির ওপর আমাদের ভরসা করতে হয়। অনেক সময় তীব্র গরম ও বাতাসে লবণের আর্দ্রতার জন্য ফসল জ্বলে যায়। সরকার কৃষি জমিকে আবাসিক ঘোষণা করার পর বছর খাজনা বেড়ে গেছে বহুগুণ।’

কৃষকদের জন্য নেই বীমা সেবা

কৃষকদের জন্য কৃষি বীমা ও শস্য বীমা থাকলেও পতেঙ্গা এবং আশপাশের উপকূলঘেঁষে চাষাবাদ করা কৃষকদের জন্য সেই চিত্র ভিন্ন।

প্রায় ১৫ বছর ধরে কৃষি কাজ করা ইউসুফ, মহিউদ্দিন, আজম, মান্নানের মত শতাধিক কৃষক জানেনই না, কিভাবে বীমা করতে হয়। কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কী কাগজপত্র লাগে কিংবা কিভাবে ক্ষতিপূরণের দাবি করতে হয়। তাই বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলালেও কৃষকদের নির্ভর করতে হয় ভাগ্যের ওপর। প্রকৃতির সামান্য রূঢ়তায় মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যায় পুরো মৌসুমের পরিশ্রম।

বীমার আওতায় আনতে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি, বেসরকারি, বীমা কোম্পানি ও এনজিও সংস্থার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখেননি এখানকার কৃষকেরা। শুধু কৃষক নন, এখানকার মৎস্য চাষী, ডেইরি, পোল্ট্রি খামারিরাও রয়েছেন বীমার বাইরে।

কৃষি খাতে যাচ্ছে পশু খামার

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘বন্দর-পতেঙ্গা জোনে অসংখ্য পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্ম রয়েছে। এ অঞ্চলের নতুন করে পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতে অভাবনীয় সম্ভাবনা রয়েছে। খামারিদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে খামারিদের অভিযোগ ছিল, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে। আমরা আগামী ১ মাসের মধ্যে পশু খামারকে কৃষি খাত হিসেবে তালিকাভুক্ত করবো।’

তিনি বলেন, ‘করোনায় পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পে উপজেলা পর্যায়ে খামারিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও নগরে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এখন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে। সরকারিভাবে পশু খামারিদের জন্য ভ্যাকসিন দেওয়ার সুবিধা রয়েছে। পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্মের মালিক পক্ষকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে রক্ষা করতে তাদেরকে বীমার আওতায় আনা হচ্ছে।’

হাঁস-মুরগির খামারে কালামের ভাগ্যবদল, মাছ চাষে ২৭ লাখ লাভ সার বিক্রেতার 5

ছাদ বাগানে ফলছে সবজি

কংক্রিটের নগরে প্রতিনিয়ত কমছে সবুজের বিস্তার। তবে ধুলোবালি, যানজট আর দূষণের ভিড়ে শহরের অনেক সচেতন মানুষ বারান্দা ও ছাদে গড়ে তুলেছেন বাগান। এমনই এক ছাদবাগানি পতেঙ্গার উজ্জ্বল। তিনি জানান, পাঁচ বছর ধরে বাড়ির ছাদে প্রায় ৫০ প্রজাতির গাছ রোপণ করেন তিনি। যেখানে আম, জাম, পেয়ারা, বড়ই, লিচু, কামরাঙ্গাসহ বিভিন্ন ফুল, শাকসবজি চাষ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ছাদের গাছগুলো আমার প্রতিদিনের মানসিক প্রশান্তি। সকালে পানি দিতে গেলে মনটা সতেজ হয়ে যায়। শুধু সৌন্দর্য নয়, কিছু শাকসবজি ফলাতে পারি। এতে পরিবারও নিরাপদ খাবার পাচ্ছে।

শুধু পতেঙ্গা নয় নগরের ইপিজেড, বন্দর, হালিশহর, আগ্রাবাদ, নিউমার্কেট ও জিইসি এলাকাতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বহু ভবনের বারান্দা ও ছাদে শোভা পাচ্ছে ছাদ বাগান।

ছাদবাগানের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পতেঙ্গা জোনের মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা পার্বতী রানী মিত্র বলেন, ‘নগরের বিভিন্ন ছাদবাগানিকে আধুনিক চাষের জন্য ভার্টিক্যাল ফার্মিং, হাইড্রপনিক্স, এরোপনিক্স পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে সহযোগিতা করা দরকার।’

বায়োগ্যাস তৈরির সম্ভাবনা

আবুল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সবুজশক্তি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নিয়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ বান্ধব, স্বাস্থ্য উপযোগী বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট খুবই কার্যকর। গরুর গোবর ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা থেকে বিনামূল্যে রান্নার বায়োগ্যাস এবং ফসল ফলাতে বিনামূল্যে জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। একবার বিনিয়োগে ২৫ বছর নিশ্চিন্তে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বন্দরনগরীর বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এমনিতেই গ্যাসের সংকট। সেখানে পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্মগুলো বায়োগ্যাস তৈরি করলে রান্নার জ্বালানি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থানও হবে।’

যা বলছেন কৃষি কর্মকর্তা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পতেঙ্গা জোনের মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা পার্বতী রানী মিত্র বলেন, ‘চট্টগ্রামে ফসলি জমিতে গৃহনির্মাণ ও কল-কারখানা স্থাপনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি। ২০১৫ সালে ১৭০০ হেক্টর আবাদি জমি ছিল, ২০২৪ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৯৮৯ হেক্টরে। এছাড়া দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরের আনন্দবাজার এলাকায় ফসলি জমি অধিগ্রহণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা পয়োঃনিষ্কাশন প্রকল্পের বিভিন্ন প্ল্যান্ট নির্মাণ করছে। চট্টগ্রাম নগরীতে হালিশহর, বন্দর, ইপিজেড ও পতেঙ্গা এলাকায় প্রায় ১২০০ কৃষক ৯৮৯ হেক্টর জমিতে টমেটোসহ অনান্য সবজির চাষ হচ্ছে। সরকারিভাবে চট্টগ্রাম নগরীতে কৃষকদের জন্য তেমন কোনও প্রকল্পের বরাদ্দ নেই।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের রাজস্ব প্রদর্শনী, মাশরুম প্রদর্শনীর পাশাপাশি সারে ভুর্তকি দিচ্ছে সরকার। কীটনাশক ও সার ডিলারদের নিয়মিত তদারকি ছাড়াও পরিবেশ বান্ধব লাভ জনক কৃষি উৎপাদনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

পার্বতী রানী মিত্র বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরে দিন দিন চাষযোগ্য আবাদি জমি পরিত্যক্ত হচ্ছে। এর মধ্যেও সুখবর হচ্ছে, উপকূলে টমেটো চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন চাষীরা। জমির পর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে টমেটো চাষ হচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তর সবসময় অন্তরিক, আমরা নিয়মিত চাষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়া প্রশিক্ষণ নিয়ে অল্প জায়গায়, অল্প পুঁজিতে মাশরুম চাষও লাভজনক।’

সেচ প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কৃষকদের জন্য পানির বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সেক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিএডিসি’র। কিন্তু এখনও পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় কোনো সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি সংস্থাটি।’

ডিজে

ksrm