হাতি ও মানুষের বিরোধ বাড়ছেই কর্ণফুলীতে, সন্ধ্যা হলে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির দল
দ্বন্দ্ব কমানোর উদ্যোগ কম, ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারে বনবিভাগ
চট্টগ্রাম নগরীর শহরতলী কর্ণফুলী উপজেলা এখন হাতির গ্রামে পরিণত হয়েছে। দুর্গম বনাঞ্চল ও পর্যাপ্ত চাষাবাদ এবং খাবার না থাকলেও হাতির পাল শহরতলীর এ উপজেলাকে স্থায়ী বসতি হিসেবে বেছে নিয়েছে। হাতি আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারছে না কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দারা। দিনের বেলায় হাতির অবস্থান কেইপিজেডের জলাশয় ও বাগানে হলেও রাতে লোকালয়ে ঘর-বাড়িতে হামলা চালায় খাবারের খোঁজে। প্রতিনিয়ত ঘটছে হতাহতের ঘটনা আর ধ্বংস করছে বাড়িঘর।
কেইপিজেডের পাহাড়ে অবস্থান করা হাতির তাণ্ডবে পাহাড়ের আশপাশে দুই উপজেলার মানুষের মাঝে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এলাকাবাসী।
এমন পরিস্থিতিতে কর্ণফুলীতে বন্যহাতি ও মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ। সে লক্ষে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন বড়উঠানের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দিদারুল আলম।
তিনি জানান, বন্য হাতিগুলোকে নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ৮ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলায় গত কিছুদিন ধরে চলে আসা হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্বে বেশ কিছু মানুষের ফসল ও ঘরের ক্ষতি হয়। একইভাবে বিভিন্ন উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। গত সোমবার এসব পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছে বনবিভাগ।
সম্প্রতি দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুল ইসলামের নির্দেশনায় পটিয়া রেঞ্জ কর্ণফুলী উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এসব ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এ উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়ন পরিষদের হলে বন্যহাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আলোচনা সভা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনা সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। পটিয়ার রেঞ্জ অফিসার নুর আলম হাফিজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আবু তাহের। এতে অতিথি ছিলেন জীববৈচিত্র কর্মকর্তা মোহাম্মদ খোরশেদ আলম ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দিদারুল আলম।
সভায় বক্তারা বীজবৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী রক্ষার ওপর জোর তাগিদ দেন। তারা বলেন, হাতি ও মানুষের মধ্যে নানা কারণে দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে মানুষের পদচারণা বেড়ে যাওয়ায় হাতির খাবার কমেছে। এ কারণে তারা প্রায়শ খাবারের খোজে লোকালয়ে নেমে আসছে। বনাঞ্চলে তাদের জন্য খাবারের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে হাতি গহীন বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ে আসবে না উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এসব বন্যপ্রাণীর ওপর সকলকে সহনশীল হতে হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলায় ১৭ জনের প্রাণহানিসহ অর্ধশতাধিক লোক আহতের ঘটনা ঘটেছে। হাতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দুই উপজেলায়। হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরাতে মশাল জ্বালিয়ে পাহারা বসিয়ে রাত কাটাচ্ছে এলাকাবাসী। এছাড়াও কেইপিজেডে পাহাড়ে অবস্থান নেওয়া হাতিগুলোর আবাসস্থল কেটে ফেলার কারণে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পরও বন বিভাগ কোন কার্য্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বনবিভাগও ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারছে। হাতি সরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে না। বরং ভাঙচুর ও ক্ষতি হলে পরামর্শ হিসেবে জিডি করতে বলা হয় ক্ষতিগ্রস্তদের। এ নিয়েও পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি।
সূত্রে আরো জানা যায়, বাঁশখালীর পাহাড় থেকে একটি হাতির দল গত ৫ বছর ধরে দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থান নেয়। খাদ্যের সন্ধানে হাতিগুলো সন্ধ্যা হলেই কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠানের খিলপাড়া, খতিবপাড়া, মাইজপাড়া, বড়উঠান, দৌলতপুর, দক্ষিণ শাহমীরপুর এলাকাসহ আনোয়ারার বারশত ইউনিয়নের কবিরের দোকান, পশ্চিমচাল, কান্তিরহাট, বটতলী ইউনিয়নের জয়নগর, ছিরাবটতলী, গুচ্ছগ্রাম, জয়নালপাড়া, বৈরাগ ইউনিয়নের দেয়াং বাজার, উত্তর গুয়াপঞ্চক, মধ্যম গুয়াপঞ্চক, খাঁনবাড়ী, মোহাম্মদপুর, বদলপুরা, বন্দর, বারখাইন ইউনিয়নের হাজীগাঁও লোকালয়ে প্রবেশ করে বাড়ী-ঘর ভাঙচুর চালিয়ে ফসল নষ্ট করে থাকে।
হাতির আতঙ্কে কোরিয়া রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল কেইপিজেডের বিদেশী নাগরিক ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। সন্ধ্যা নামলেই পুরো কেইপিজেড জুড়ে নেমে আসে হাতির ভয়। বর্তমানে ২৩টি কারখানায় আনোয়ারা-কর্ণফুলী ও আশপাশের এলাকার প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তাদের অনেকে পায়ে হেঁটে কারখানায় যাওয়ায় তারা আছেন হাতির ভয়ে। পাহাড়ে অবস্থান নেওয়া হাতির দলটি কেইপিজেডের অসংখ্য গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতি করেছে।
কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিনা সুলতানা জানান, হাতির আক্রমণে কর্ণফুলীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি বনবিভাগ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।