আবারও চট্টগ্রামে ফিরতে মরিয়া সাবেক সিসিএস, দপ্তরে আগুনের ঘটনা তদন্তে কমিটি
দুর্নীতির অভিযোগে স্থগিত হয় বেতন বৃদ্ধি
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা বদলির পর ফের একই পদে ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এজন্য তিনি কোটি কোটি টাকা খরচ করার হুংকারও দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি দপ্তরে আগুন লেগে নথি পুড়ে যাওয়ার পর তাকে বদলি করা হয়। এর আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও তিনি শোধরাননি, বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন এবং গড়ে তোলে নিজস্ব সিন্ডিকেট।
রেলের ওই কর্মকর্তার নাম বেলাল হোসেন সরকার। তাকে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের (সিসিএস) পদ থেকে গত ১৫ মার্চ বদলি করা হয়। বর্তমানে তাকে ওএসডি (বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রেলভবনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে পাহাড়তলী সিসিএস দপ্তরের পি-টু শাখায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এরপর এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে আহ্বায়ক করা হয় জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ক্রয়-১) আরিফুজ্জামান সিকদারকে। এছাড়া জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ক্রয়-২) গোলাম মোর্শেদকে সদস্যসচিব, বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী-২, বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী ও চট্টগ্রামের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কামান্ড্যান্টকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। কমিটিতে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ার পর থেকে বেলাল হোসেন সরকার নিজেকে ৯০ এর দশকের বুয়েট ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি কোনো ছাত্ররাজনীতি ও কমিটিতেই সম্পৃক্ত ছিলেন না।
এর আগে আওয়ামী সরকারের আমলে দুই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের আশীর্বাদে রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রেলের বিভিন্ন ব্যবসা বেনামে বাগিয়ে নেন। একইসঙ্গে দুর্নীতির মাধ্যমেও ঢাকার অভিজাত এলাকায় তার বেশ ফ্ল্যাট আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হলে তিনি জামায়াতঘেঁষা হয়ে ওঠেন। জামায়াতের এক নেতাও তার জন্য সাবেক রেলপথ উপদেষ্টার কাছে বেশ কয়েকবার তদবিরও করেন। সম্প্রতি এক ঠিকাদারের সঙ্গে রেল শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের এক নেতার কথোপকথনের একটি অডিও ফাঁস হয়। সেই অডিওতে ঠিকাদারকে উদ্দেশ্য করে ওই নেতাকে বলতে শোনা যায়, ‘একটা কথা বলি ভাই, আপনি আমার অনেক সিনিয়র। ঠাণ্ডা মাথায় চলেন। বেলাল হোসেনে অনেক উপরের লেভেলে চলে। আপনি উনার এসব বলে লাভ আছে। এসব সব রেল কর্মকর্তার আছে, আমারও আছে। তাতে কি।’
তবে বদলি আদেশের পর তিনি বিভিন্ন জায়গায় ক্ষোভ ঝারতে থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রেল কর্মকর্তা জানান, তাদের সামনেই বদলির আদেশ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন বেলাল হোসেন সরকার। এ সময় তিনি বলেন, এই রোজার ঈদের পর ২৭ তারিখের মধ্যে এই আদেশ বাতিল না হলে মন্ত্রণালয়ের অনেকেই স্বপদে বহাল থাকতে পারবে না।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর কিছু রেল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গজিয়ে ওঠা ‘বৈষম্যবিরোধী রেল ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের কয়েকজন সদস্য ও কিছু ব্যবসায়ীদের নিয়ে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এরপর তাদের মাধ্যমে রেলের বিভিন্ন কাজ নিয়ে থাকেন। সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা প্রায় চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুরের। এছাড়া আবারও চট্টগ্রামে স্বপদে ফিরতে তিনি একটি রেস্টুরেন্টে চট্টগ্রামের এক এমপির সঙ্গেও বৈঠক করেন।
তবে ২০২৫ সালের ১৮ জুন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে বেলাল হোসেন সরকারের এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হয়। তখন তিনি রাজশাহীর সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম) ছিলেন।
বেলাল উদ্দিন সরকারের ওএসডি বাতিল প্রসঙ্গে কথা হয় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে। একাজে ৫ কোটি টাকা খরচ করছেন এমন গুঞ্জন রয়েছে বলে জানালে তিনি হেসে বলেন, ‘আমি শুনলাম ১ কোটি টাকা, আপনি বলছেন ৫ কোটি—কোনটা বিশ্বাস করি?
তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। সেই রিপোর্ট সচিব, মন্ত্রী দেখে সিদ্ধান্ত দিবেন। স্বচ্ছতা, ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’
রেলওয়ের সাবেক এক সংস্থাপন কর্মকর্তা জানান, আইনানুসারে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রককে পুনরায় পদে বহাল করতে হলে তার স্থানে নিযুক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রককে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক সমপদে বহাল করতে হবে, যা সম্ভব নয়।
ডিজে



