চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে আড়াই বছরে ৩৪ জনের মৃত্যু, ৭২ রেলগেটের ৫৬টিই অরক্ষিত

‘অটোমেটিক সিস্টেম’ ধুঁকছে লোকবলের অভাবে

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ৭২ রেলগেটের (লেভেল ক্রসিং) মধ্যে ৫৬টি অরক্ষিত। এসব অরক্ষিত গেটে নেই কোনো প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার, নেই গেটম্যানও। লোকবল না থাকায় উন্নত ‘অটোমেটিক সিস্টেমের’ সুফলও পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। আড়াই বছরে এই রুটে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৪ জন। এর মধ্যে আবার অনেকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে আড়াই বছরে ৩৪ জনের মৃত্যু, ৭২ রেলগেটের ৫৬টিই অরক্ষিত 1
লোহাগাড়ার আধুনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের অদূরে রেলগেটে গেটম্যান না থাকায় এমন সতর্কবার্তার ফলক বসিয়েছে রেলওয়ে

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন-১) দপ্তর থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম- কক্সবাজার রুটে ৭২টি রেলগেট রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ গেট আছে ১৬টি, যা ৫৪ গেটম্যান দিয়ে পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এরপরও ৫৬টি রেলগেট অরক্ষিত রয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা চলাচলের সুবিধায় এসব গেট তৈরি করেছেন, আবার অনেকগুলো রেলগেট গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে নেই কোনো তদারকি। ফলে সিগন্যাল না মেনে হুটহাট লোকজন ও গাড়ি ঢুকে পড়ে রেললাইনে। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা।

আরও জানা গেছে, এসব রেল গেট সুরক্ষিত রাখার ইচ্ছে থাকলেও, তহবিলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। রেল ও প্রকল্পের অধীন চুক্তিভিত্তিক এসব গেটম্যানদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগে উন্নত অটোমেটিক ট্রাফিক সিস্টেম রয়েছে। এতে করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন আসার আগে গেট ব্যারিয়ার পড়ে যায় এবং ট্রেন চলে যাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে উঠে যায়। মূলত দুর্ঘটনা রোধ করতেই আধুনিক এই পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু অভিজ্ঞ লোকবলে অভাবে এই সিস্টেমও আলোর মুখ দেখছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন-১) দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইমরান বলেন, ‘আরও জনবল বৃদ্ধি করতে রেল মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

রেলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মো. ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, ‘রেলের অটোমেশন সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকলেও মানুষ সচেতন নন। অটোমেটিক রেল গেট অটোমেটিক বন্ধ খোলার সিস্টেম আছে, তবে মানুষ এই সিস্টেমের সাথে পরিচিত নন। ফলে অস্ত্র থাকলেও তা ব্যবহারের সুযোগ নেই।’

অরক্ষিত রেল গেট প্রসঙ্গে বিভাগীয় কর্মব্যবস্থাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেলওয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী দপ্তরের অধীনে ১৬টি গেটে ৫৪ জন অস্থায়ী গেটম্যান রয়েছে। অপর ৫৬টি গেট রয়েছে অরক্ষিত। ৫৪ জন গেটম্যানের বেতন-ভাতা প্রকল্প ও রেলওয়ে মিলে প্রদান করছে।’

আড়াই বছরে ৩৪ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে গত আড়াই বছরে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অনেক অজ্ঞাত লাশ আছে, যাদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। এখনও পর্যন্ত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩০টি।

রেল পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রেনে কাটা ও দুর্ঘটনায় এই ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে গোলবাহার বেগম (৫৮) নামে এক বৃদ্ধা নিহত হন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের রেললাইন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত গোলবাহার বেগম পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং এজাহার আহমদের মেয়ে।

২০২৫ সালের ২ আগস্ট ট্রেনের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারায় পাঁচজন। ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ছিটকে পড়ে সড়কের পাশে। এতে নিহতরা হলেন—চালক হাবিব উল্লাহ (৫০), অটোরিকশার যাত্রী রেনু আরা (৪৫), তাঁর বোন আসমা আরা (১৩), রেনু আরার তিন বছর ও দেড় বছর বয়সী দুই ছেলে আশেক উল্লাহ ও আতা উল্লাহ।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ওই চার যাত্রী রামু যাচ্ছিলেন। পথে রামুর রশিদনগর রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। এটি এলাকার সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা।

৩১ আগস্ট এক দিনমজুরের ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়। লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের আলী বাপের পাড়া এলাকায় পাওযায় তার লাশ। নিহত দিনমজুরের নাম মো. হাসান (৪২)। তিনি ওই ইউনিয়নের হাদুর পাহাড় এলাকার সৈয়দ আহমেদের ছেলে। এলাকায় তার একটি পানের বরজ ছিল।

এছাড়া একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর চন্দনাইশে রেললাইনের ট্রেনে কাটা পড়ে নয়ন (২৮) নামের এক যুবক নিহত হন। ২৪ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিহত হন। এরপর ২৫ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে রেজু আরা বেগম (৫২) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। রেজু আরা ওষুধ কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।

গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান বলেন, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ জন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৩০টি। আবার কয়েকটি লাশের পরিচয় এখনও শনাক্ত হয়নি।’

গেটম্যান নেই, তদারকিও নেই

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেল গেটে গেটম্যান না থাকায় যেমন দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকি রয়েছে তেমনি রেললাইনে তদারকিও নেই বললেই চলে। ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পাথর নিক্ষেপকারী ও ছিনতাইকারীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। রেল পুলিশ এমন স্পটগুলোকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

রেল পুলিশ চট্টগ্রামের ওসি রফিকুল হাসান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল রুটের ঈদগাঁ, ডুলাহাজারা, রামু এবং চকরিয়ার মধ্যবর্তী তিনটি কালভার্ট ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব রেড জোন থেকে চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে চার দিনের ব্যবধানে তিনজন আহত হন।

এছাড়া গত ৩ মার্চ রাতে পর্যটন এক্সপ্রেসে ট্রেনে বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। রামু ও ইসলামাবাদ স্টেশনের মধ্যবর্তী জোয়ারি পাড়া এলাকায় চারপাশের বিল, জমি ও বনের আড়াল থেকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। ধারণা করা হয়, নির্জন এলাকায় ব্রিজের আশপাশ থেকে এভাবে পাথর নিক্ষেপ ডাকাতির উদ্দেশ্যে করা। জায়গাটি নিরিবিলি ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় চালক প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালিয়ে এলাকা পার হন।

ডিজে

ksrm