রমজান: রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস

রমজান মাস এলেই মুসলিম বিশ্বের আকাশে ভেসে ওঠে এক অনন্য ঘোষণা, ‘রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’ হাদিসে কুদসিতে মহানবী (সা.) বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম; তা শুধু আল্লাহর জন্য এবং এর প্রতিদান তিনি নিজেই দেবেন। বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় খাদ্য, পানীয় ও সম্ভোগ বর্জন করে। এ কারণেই সব ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেও রোজাকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

রমজানের রোজা মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ এনে দেয়। গুনাহ মানুষের সঙ্গে তার রবের সম্পর্কের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করে, ফলে সেই সম্পর্ক শিথিল হয় এবং বান্দা করুণা থেকে বঞ্চিত হয়। রমজানে মহান আল্লাহ অজস্র রহমত ও করুণা বর্ষণ করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন রমজান উপস্থিত হয় তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অভিশপ্ত শয়তানদের শেকলবদ্ধ করে রাখা হয়। ফলে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে হাজির হয় পবিত্র মাহে রমজান, যা বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক মর্যাদাশীল ও বরকতপূর্ণ।

আল্লাহ নিজেই প্রতিদান দেবেন

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য; কিন্তু রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের ঘ্রাণের চেয়েও বেশি সুগন্ধযুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, রোজার বিষয়টি ভিন্ন, কারণ রোজা শুধু তাঁর জন্য এবং এর প্রতিদান তিনিই দেবেন।

তাকওয়া অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ

রোজা তাকওয়া অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা)। খোদাভীতি চর্চার এ মাসটি তাই আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়।

কোরআন নাজিলের মাস

পবিত্র রমজান মাসেই মহাগ্রন্থ আল কোরআনের অবতরণ শুরু হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েতস্বরূপ এবং হেদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)।

কেয়ামতের দিন রোজার সুপারিশ

হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, সে তাকে দিনে খাদ্য ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত রেখেছিল; কোরআন বলবে, সে তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছিল। উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।

জাহান্নাম থেকে মুক্তি

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিনও রোজা পালন করে, আল্লাহ তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেন। রমজান তাই তাকওয়া অর্জন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে।

হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রজনী

রমজানে রয়েছে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ বলেন, ‘কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর : আয়াত ৩)। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাস ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়াম করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাত, অর্থাৎ শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে এ রজনী অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। কোরআন নাজিলের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে থাকায় এ রাতকে ভাগ্য রজনীও বলা হয়।

রোজা সেরা আমল

হজরত আবু উমামা (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি রোজাকে আঁকড়ে ধরতে বলেন এবং উল্লেখ করেন, রোজার সমকক্ষ কিছু নেই।

রমজানে ওমরাহ ও ক্ষমার ঘোষণা

রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজানের ওমরাহ একটি হজের সমতুল্য অথবা তাঁর সঙ্গে হজ করার সমতুল্য। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি সওয়াবের নিয়তে রাত জেগে ইবাদত করবে, তারও পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করা হবে। একই ঘোষণা রয়েছে কদরের রাতে ইবাদতের ক্ষেত্রেও।

রাইয়ান দরজা

জান্নাতের আটটি দরজার একটি ‘রাইয়ান’, যা শুধু রোজাদারদের জন্য নির্ধারিত। কেয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদাররা প্রবেশ করবেন। তাদের প্রবেশের পর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

তারাবিহ, ইতিকাফ ও বিশেষ ইবাদত

তারাবিহ নামাজ রমজানের বিশেষ উপহার এবং শবে কদর এ মাসের বিশেষ তোহফা। এ মাসে নেক আমলের ফজিলত ৭০ গুণ বৃদ্ধি করা হয় এবং নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ফরজের সমান হয়। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন যত দিন না আল্লাহ তাঁকে ওফাত দেন। ইতিকাফের অর্থ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা।

রোজাদারের দুটি আনন্দ

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে; একটি ইফতারের সময়, অন্যটি আল্লাহর সাক্ষাতের সময়। ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। এ সময়ের দোয়া হলো, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিরাহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়িন আন তাগফিরা লি জুনুবি।’

সাদাকাতুল ফিতর ও দান

সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের প্রথম দিনে দান ও ঈদ উদ্যাপনের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করা হয়, তাই এ দান সাদাকাতুল ফিতর। দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে এটি ওয়াজিব হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাকে অনর্থক ও অশালীন বাক্যালাপ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্বদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য। আয়েশা (রা.) বলেন, রমজানে রাসুল (সা.)-এর দান-সদকার উৎসাহ বেড়ে যেত এবং তিনি এ মাসকে সহানুভূতির মাস হিসেবে ঘোষণা করেন। শেষ দশকে যারা ইতিকাফে বসেন না, তাদের জন্যও বেশি বেশি দান-খয়রাত করার তাগিদ রয়েছে, বিশেষত লাইলাতুল কদরে দান হাজার মাসের সমান সওয়াব বয়ে আনে।

পরিশেষে বলা যায়, প্রত্যেক নেক আমলের নির্দিষ্ট সওয়াব থাকলেও রোজার প্রতিদান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে নির্ধারিত। রমজানের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত পালনের মধ্য দিয়ে তাকওয়া অর্জন এবং জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজা দিয়ে প্রবেশের প্রত্যাশাই মুমিনের চূড়ান্ত সফলতা।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm