রমজান সামনে রেখে নদী ও সমুদ্রে জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ানোর অভিযোগ সামনে রেখে এবার সরাসরি অভিযানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দরে অভিযান চালায় দুদক, জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১-এর একটি এনফোর্সমেন্ট টিম। টিম লিডার হিসেবে এতে নেতৃত্ব দেন সহকারী পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ ইমরান হোসেন।

চট্টগ্রাম প্রতিদিনে ‘সাগরে ভাসছে ৬০০ গুদাম, ছয় আমদানিকারকের জিম্মায় রোজার বাজার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই অভিযান পরিচালিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান সামনে রেখে ছয় বড় আমদানিকারকসহ একটি বড় সিন্ডিকেট প্রায় ১০ লাখ টনের বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে অন্তত ৬০০ লাইটার জাহাজ দেশের নদী ও সাগরে মাসের পর মাস ভাসিয়ে রেখেছে। গম, ভুট্টা, ছোলা, ডাল, সয়াবিন ও চিনির মতো খাদ্যপণ্য ঘাটে নামার বদলে জাহাজেই আটকে থাকায় একদিকে লাইটার সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অভিযান
দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অসৎ উদ্দেশ্যে দাম বাড়ানোর অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকারকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে লাইটার জাহাজ থেকে দীর্ঘদিন পণ্য খালাস না করে সেগুলোকে নদী ও সমুদ্রে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দপ্তরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাভাবিক অবস্থায় একটি লাইটার জাহাজ যেখানে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা, সেখানে বর্তমানে অনেক জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে পণ্যবোঝাই অবস্থায় নদী ও সাগরে ভাসছে।
নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তদারকি
দুদকের অভিযানে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়েও অনুসন্ধান চালানো হয়। নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে স্মারক নং-৭১৩ মূলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি অফিসিয়াল পত্র জারি করে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনাপত্তি সনদ ছাড়া কোনো লোকাল এজেন্ট ও পণ্যের এজেন্টকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত না রাখার নির্দেশ দেন।
দুদক জানায়, ওই পত্রের আলোকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমানে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনাপত্তি সনদ গ্রহণ করছে না বলে মহাপরিচালক নিশ্চিত করেছেন। এরপরও বন্দরের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার অপারেশন, হারবার মাস্টার ও ডেপুটি কনজারভেটর দপ্তরের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে।
লাইটার নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি
পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে যে অস্পষ্টতা রয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যমান আইন ও বিধির আলোকে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, অভিযানে সংগৃহীত রেকর্ডপত্র ও বক্তব্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব তথ্য বিশ্লেষণ শেষে এনফোর্সমেন্ট টিম কমিশনের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। রমজানের আগে ভাসমান গুদাম ইস্যুতে এই অভিযান বাজার পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলে, সে দিকে এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
ঘাটের বদলে জাহাজে ভাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য
রমজান সামনে রেখে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মূল চিত্র উঠে এসেছে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, দেশের ছয় বড় আমদানিকারকসহ একটি বড় সিন্ডিকেট প্রায় ১০ লাখ টনের বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নিয়ে অন্তত ৬০০ লাইটার জাহাজ মাসের পর মাস দেশের নদী ও সাগরে আটকে রেখেছে। গভীর সমুদ্র থেকে নামানো গম, ভুট্টা, ছোলা, ডাল, সয়াবিন ও চিনি ঘাটে নামার বদলে জাহাজেই ভাসছে। এর ফলে একদিকে লাইটার জাহাজের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আসন্ন রমজানে পণ্যের ঘাটতি ও দাম বাড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
বহির্নোঙরে রেকর্ড সংখ্যক মাদার ভেসেল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একযোগে রেকর্ড ১৭৬টি মাদার ভেসেল নোঙর করে আছে। এর মধ্যে ৬১টি জাহাজে রয়েছে গম, ভুট্টা, ছোলা ও সয়াবিনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। বহির্নোঙরে থাকা অন্তত ১১০টি মাদার ভেসেল বন্দরের ভেতরে ঢুকবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। এসব জাহাজ থেকে গভীর সমুদ্রেই লাইটার জাহাজে পণ্য তুলে দেশের বিভিন্ন জেটি ও নদীপথে পাঠানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বড় একটি অংশ লাইটারেই আটকে থাকছে এবং সেগুলো কার্যত ভাসমান গুদামে পরিণত হয়েছে।
ছয় আমদানিকারকের দখলে ভাসমান গুদাম
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আকিজ গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব ভাসমান গুদামের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শুধু আকিজ গ্রুপের দখলেই রয়েছে প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজ, যেগুলোতে সার, বিটুমিন, সরিষা, ভোজ্যতেল, গম ও চিনি রয়েছে। এরপর লাইটার আটকে রাখার ক্ষেত্রে বড় অবস্থানে আছে নাবিল গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ। আমদানি ভলিউম তুলনামূলক কম হওয়ায় সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের জাহাজ সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম।
১৫ দিনের লাইটার ৩০–৪০ দিনও ভাসছে
স্বাভাবিক সময়ে একটি লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে অনেক জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে নদী ও সাগরে ভাসমান গুদাম হয়ে আছে। এতে নতুন করে পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় লাইটারের সংকট আরও বেড়েছে এবং বন্দরজুড়ে খালাস কার্যক্রমে ধীরগতি নেমে এসেছে।
লাইটার সংকটে থমকে রমজানের খালাস
বন্দর সূত্র জানায়, রমজান সামনে রেখে আমদানির চাপ বাড়লেও লাইটার সংকটের কারণে খালাস কার্যক্রম থমকে আছে। ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে মোট ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল, যেগুলোতে ছিল ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য। এর মধ্যে ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজানসংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য এবং আরও পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি ছিল। যেসব জাহাজ স্বাভাবিক সময়ে সাত থেকে ১০ দিনে খালাস শেষ করার কথা, সেগুলো এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকছে।
কেন লাইটারেই পণ্য আটকে রাখা হচ্ছে
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাড়া গুদামের তুলনায় কম খরচ হওয়ায় গত এক দশক ধরে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। গুদামে নামালে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নজরদারিতে মজুতের হিসাব থাকে, কিন্তু লাইটারে পণ্য রেখে দিলে সেই হিসাব সহজে পাওয়া যায় না। এতে চাহিদার সময় পণ্য আটকে রেখে বাজারে সংকট সৃষ্টি ও দাম বাড়ানো সহজ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নির্দেশ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও সর্বশেষ দুদকের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ‘ভাসমান গুদাম’ ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সিপি



