চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করার এক মহোৎসব চলছে, যেখানে প্রশাসনিক সীমানার মারপ্যাঁচকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকরা। সাতকানিয়ার পাহাড় কেটে সেই মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাশের উপজেলা বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের লটমনি মৌজায় অবস্থিত চারটি অবৈধ ইটভাটায়। দুই উপজেলার সীমান্তের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেদারসে পাহাড় ধ্বংস করা হলেও আইনি সীমাবদ্ধতার অজুহাতে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে গত ১৯ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর নামমাত্র একটি মামলা করলেও প্রভাবশালীদের বাদ দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসনিক সীমানার ফাঁদে পাহাড় কাটা
সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিমে এওচিয়ার ছনখোলার উত্তর পাশে লটমনি মৌজায় গড়ে উঠেছে হারুনের মালিকানাধীন এইচবিএম ইটভাটা, নুরুল আলম কোম্পানির ওয়ানস্টার ইটভাটা, এএসসি ইটভাটা এবং জামাল কোম্পানির জেবিএম ইটভাটা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ইটভাটাগুলো মূলত বাঁশখালী উপজেলার প্রশাসনিক এলাকার ভেতরে পড়লেও এগুলো সংলগ্ন পাহাড়গুলো সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত।
সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন যখন এওচিয়ার পাহাড় কাটা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে যায়, তখন ইটভাটাগুলো লটমনি মৌজায় হওয়ায় তারা প্রশাসনিক এখতিয়ারের অভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ যেন এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা, যেখানে এওচিয়ার পাহাড়ের মাটি পুড়ছে বাঁশখালীর ইটভাটায় কিন্তু জরিমানা গুনতে হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে।
মালিকদের দাপট ও দোটানা
পাহাড় কাটার এই স্পটগুলো পরিদর্শনের সময় ইটভাটার মালিকরা দম্ভের সঙ্গে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের প্রশাসনিক রক্ষাকবচের কথা জানান। সাতকানিয়ার সংবাদকর্মীদের কাছে তারা দাবি করেন, তাদের ভাটা বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নে অবস্থিত হওয়ায় সাতকানিয়া প্রশাসনের কোনো ঝামেলা নেই। আবার বাঁশখালীর সাংবাদিকরা পাহাড় কাটার তথ্য জানতে চাইলে মালিকরা পাল্টা যুক্তি দেন যে পাহাড়গুলো সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত, তাই বাঁশখালী প্রশাসনের সেখানে জরিমানা করার কোনো আইনগত অধিকার নেই।
মূলত ইটভাটাগুলো একই জোনে অবস্থিত হলেও খতিয়ানগত ভিন্নতার এই সুযোগটিই তারা কাজে লাগাচ্ছে। এওচিয়ার ছনখোলার জনৈক ইটভাটা মালিক আক্ষেপ করে বলেন, লটমনি মৌজার ভাটাগুলো একই এলাকায় হওয়ায় তারা পাহাড় কাটলে সাংবাদিকরা সাতকানিয়ার মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করে এবং পরে সাতকানিয়া প্রশাসনের অভিযানের বলি হতে হয় তাদের।
পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনের ভূমিকা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এএসসি ইটভাটায় পাহাড় কাটা নিয়ে বারবার অভিযোগ ওঠায় পরিবেশের কথা বিবেচনা করে মালিক মোর্শেদ কোম্পানি সেটি ছেড়ে দিয়েছেন। তবে বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণে আছেন লোহাগাড়া উপজেলার কুখ্যাত পাহাড়খেকো হিসেবে পরিচিত মালিক শাহ আলম। ইতিপূর্বে লোহাগাড়ায় পাহাড় কাটার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক স্থানীয় সাংবাদিক তার হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। সেই কুখ্যাতি পুঁজি করে তিনি এখন এওচিয়ার পাহাড় কাটার বৈধতা খুঁজে বেড়ান।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামশেদুল ইসলাম বলেন, ওই ইটভাটাগুলোর বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং ইতিমধ্যে তিনি একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে একটি অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
মামলার নেপথ্যে বৈষম্যের অভিযোগ
পাহাড় কাটার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. শাহ আলম ও বাঁশখালীর সারোয়ার আলমের বিরুদ্ধে সাতকানিয়া থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। তবে পাহাড় ধ্বংসের মূল কারিগর হিসেবে পরিচিত জেবিএম ইটভাটার মালিক জামাল কোম্পানি, এইচবিএমের মালিক হারুন এবং ওয়ানস্টারের মালিক নুরুল আলম কোম্পানিকে এই মামলা থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কাটার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই প্রভাবশালী চক্রকে মামলার বাইরে রাখায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


