কানাডা ভিসার নামে চান্দগাঁওয়ে ৫১ লাখের লেনদেন, নগদ ৩৯ লাখের সাক্ষী নেই
বিএমইটির জবাবের আগেই পিবিআই প্রতিবেদন, জালিয়াতির ধারা বাদ
কানাডায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৪ টাকা নেওয়ার অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহপাঠী পরিচয়ে কানাডা প্রবাসী মো. সাইফুল ইসলাম রুবেল ভুক্তভোগীকে বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখান। পরে তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে ধাপে ধাপে টাকা নিতে থাকেন। দীর্ঘ তিন বছর ভুয়া অফার লেটার ও জাল কাগজপত্র দেখিয়ে আশ্বস্ত রাখার পরও ভিসা না হওয়ায় বিষয়টি প্রতারণা হিসেবে সামনে আসে। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা সিআর মামলা নম্বর ১৪৫/২০২৫-এর তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মামলার বাদী হারুনর রশীদ (৩২) সাতকানিয়া উপজেলার সুইপুরা গ্রামের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার এ ব্লকে থাকেন। এজাহারে কানাডা প্রবাসী মো. সাইফুল ইসলাম রুবেলকে প্রধান আসামি করে মোট ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রুবেলের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, মা সালেহা বেগম, বোন আসমাউল জান্নাত, ভাই জহিরুল ইসলাম, ফুফাত ভাই আরিফ, বন্ধু আবু বক্কর সেলিম, রুবেল উদ্দিন, কানাডা প্রবাসী বন্ধু সাঈম এবং তার স্ত্রী নুসরাত জাহান মৌসহ পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা।
স্বপ্নের শুরু, দুঃস্বপ্নের পরিণতি
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহপাঠী রুবেল ফোন করে হারুনর রশীদকে কানাডায় যাওয়ার প্রস্তাব দেন। রুবেল নিজেকে ম্যানপাওয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দাবি করে বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ওই ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার কথায় আস্থা রেখে হারুনর রশীদ রাজি হয়ে যান এবং এরপর শুরু হয় বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া।
এজাহার ও পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত আবু বক্কর সেলিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর ৩ লাখ ৩৫ হাজার ২০০ টাকা, ২১ নভেম্বর ১ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং ১৪ ডিসেম্বর ৮০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। অভিযুক্ত আসমাউল জান্নাতের অ্যাকাউন্টে ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর ২০ হাজার ৪৪০ টাকা, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি ৩০ হাজার টাকা এবং ৩১ জানুয়ারি ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। নুসরাত জাহান মৌয়ের অ্যাকাউন্টে ২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৭৪ টাকা এবং জহিরুল ইসলামের অ্যাকাউন্টে ২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ২৬ হাজার টাকা পাঠানো হয়। রুবেল উদ্দিনের অ্যাকাউন্টে ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর ২০ হাজার টাকা এবং শারমিন আক্তারের অ্যাকাউন্টে ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এছাড়া বিকাশের বিভিন্ন নম্বরে রুবেলের নির্দেশে ২৬ হাজার ৫০০ টাকা পাঠানো হয়।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ নগদে দেওয়ার কথাও মামলায় উল্লেখ আছে। এজাহারে বলা হয়, ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর রুবেলের ফুফাত ভাই আরিফকে ৪ লাখ ২ হাজার টাকা, ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর দেশে এসে রুবেলকে ২৬ লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা এবং ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ রুবেলের বাবা মোস্তাফিজুর রহমানকে ৯ লাখ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকা নগদ দেওয়া হয়। এভাবে ব্যাংক, বিকাশ ও নগদ মিলিয়ে মোট ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৪ টাকা হস্তান্তর করেন হারুনর রশীদ।
ভুয়া কাগজে আশ্বাস
অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগীকে আস্থায় রাখতে বিভিন্ন সময় ভুয়া কাগজপত্র দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর তাকে একটি অফার লেটার দেওয়া হয়, যা পরে ভুয়া বলে দাবি করা হয়। এছাড়া ভুয়া ইন্স্যুরেন্স কার্ড ও জব লেটার দেখিয়ে তাকে আশ্বস্ত করা হয়। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও ভিসা প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ৭ জানুয়ারি ২০২৫ সালে রুবেলের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং হুমকি দেন। পরদিন ৮ জানুয়ারি রাত ৮টা ৫০ মিনিটে চান্দগাঁওয়ের ইজিলি স্কাই শপ মার্কেটের নিচে রুবেলের বন্ধু সেলিমের সঙ্গে দেখা হলে তিনি প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে বাদীর দাবি।
পিবিআই তদন্তে যা উঠে এলো
ফৌজদারি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে। গত ২৯ জানুয়ারি পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক আল আমিন ১৯০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন। তদন্তে বাদীর দেওয়া ব্যাংক ও বিকাশ লেনদেন যাচাই করে ১১ লাখ ৪১ হাজার ৭১৪ টাকা জমা দেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে প্রতিবেদনের অন্য অংশে মোট ৫১ লাখ ৪৫ হাজার ৩১৪ টাকা প্রদানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে নগদে দেওয়া ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১০০ টাকার কোনো সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কীভাবে এত বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংক থেকে তুলে কার সামনে নগদ দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যও প্রতিবেদনে নেই। তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, নগদ ও ব্যাংক লেনদেন মিলিয়ে আসামিরা বাদীর কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করলেও তাকে কানাডা না নিয়ে আত্মসাৎ করেছে, যা সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০ ও ৩৪ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ৫০৬ ধারার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তদন্তে প্রশ্নচিহ্ন
ঘটনা ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে কিছু অস্পষ্টতা দেখা গেছে। ব্যাংক ও বিকাশে প্রায় ১১ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ মিললেও ৩৯ লাখ টাকার নগদ লেনদেনের কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই। তবু মোট অর্থের অঙ্ক উল্লেখ করে বাদীর দাবিকে সত্যায়িত করা হয়েছে কীভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া ভিসার ধরন নিয়েও কোনো স্পষ্টতা নেই। টুরিস্ট নাকি ওয়ার্ক ভিসা—এ বিষয়ে কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না। ভিসা প্রক্রিয়ার মোট খরচ, ভিসা না হলে টাকা ফেরতের নিয়ম কিংবা সেবার ধরন সম্পর্কেও কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি।
আরেকটি বিষয় হলো, ২০২২ সালের নভেম্বরে ভুয়া অফার লেটার পাওয়ার পরও ভুক্তভোগী ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও বারবার টাকা দিয়েছেন কেন—সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
তদন্তে জালিয়াতির ধারা প্রমাণিত না হওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, অফার লেটার যাচাই করতে সরকারি বিএমইটিতে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। সেই জবাব পাওয়ার আগেই তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দেন। এজাহারে ৮ জানুয়ারি ২০২৫ রাত ৮টা ৫০ মিনিটে চান্দগাঁওয়ের ইজিলি স্কাই শপ মার্কেটের নিচে সেলিমের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলা হলেও ওই সময় সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন কি না, তার মোবাইল লোকেশন যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
প্রতারণা থেকে বাঁচার আইনি পথ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করলে অবশ্যই লিখিত চুক্তি করা প্রয়োজন। সেখানে সেবার ধরন, মোট খরচ, পরিশোধের নিয়ম এবং ভিসা না হলে টাকা ফেরতের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় মামলা করা যায়। যদি কোনো ট্রাভেল এজেন্সি জড়িত থাকে, তবে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর আওতায়ও মামলা করার সুযোগ রয়েছে। সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়া কারও সঙ্গে লেনদেন না করা এবং সব ধরনের অর্থ লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করে রসিদ সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন আইনজীবীরা।
চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী আশিফুর কমল বলেন, ‘এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার মামলা। পিবিআইয়ের তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে আশা করছি। আদালত দ্রুত বিচার কার্যক্রম শেষ করে ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার দেবেন।’
তবে পিবিআই প্রতিবেদনে নগদ লেনদেনের অস্পষ্টতা এবং জালিয়াতির ধারা প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সঠিক দলিল ও প্রমাণ সংরক্ষণের গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য।
সিপি



