ছাত্রদলে ঢুকেই ৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা, বিএনপি আমলে এই প্রথম

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিন্দা

দেড় মাস আগে ছাত্রদলে যোগ দিয়ে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর এবার সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা ঠুকে আলোচনায় এসেছেন কথিত এক সাবেক ‘সমন্বয়ক’। দেড় মাস আগে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে এটিই প্রথম মামলা।

গত ১৫ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকীসহ কয়েকজন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন।
গত ১৫ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকীসহ কয়েকজন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কাজী মিজানুর রহমানের আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক’ পরিচয়দানকারী মো. রিদুয়ান ওরফে রিদুয়ান সিদ্দিকী। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর এলাকার শাহ সিদ্দিক বাড়ির আবদুর রহিম ও কুলচুমের ছেলে।

আদালত আগামী ৫ মের মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সাইবার মামলায় সাত সাংবাদিক আসামি

মামলায় আসামি করা হয়েছে সাতজন সাংবাদিককে। তারা হলেন দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার, যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও আজকের পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সবুর শুভ এবং চ্যানেল আইয়ের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ।

তাদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫–এর ২৬(১) ও ২৬(২) সংশোধিত ধারায় সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। এই আইনের প্রয়োগকে অনেক সময় ভীতি ও হয়রানির কারণ হিসেবে দেখা হয়। গত কয়েক বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক, রাজনীতিক, শিল্পী, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, গার্মেন্টসকর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরও আসামি হয়ে কারাভোগ করতে হয়েছে।

সার্কিট হাউস ঘটনায় জিডি

এর আগে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন সাংবাদিক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার। জিডিতে বলা হয়, গত ৫ মার্চ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে এক বৈঠক চলাকালে সংঘবদ্ধভাবে মব সৃষ্টি করে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার নেতৃত্ব দেন সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা।

জিডিতে উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়েও তিনি ও তার সহযোগীদের নেতৃত্বে এই হামলা সংঘটিত হয়। ঘটনার প্রতিবাদ করায় রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে শারীরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, যা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

দেড় মাস আগে ছাত্রদলে যোগ দিয়েই বেপরোয়া

গত ১৫ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী রিদুয়ান সিদ্দিকীসহ কয়েকজন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন। এ সময় চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, যার ফলাফল আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে, সরওয়ার আলমগীর তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন রুবেল।

এর পর থেকে রিদুয়ান সিদ্দিকী নিজেকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলালের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন বলে বিভিন্ন মহল থেকে জানা গেছে।

আগেও সহিংসতার অভিযোগ

এর আগেও তার নেতৃত্বে সহিংস ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ১ জুলাই পটিয়ায় তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের এক নেতাকে মব তৈরি করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশের সামনেই তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ সময় একদল লোক নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে থানায় ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। এতে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জাহেদ মো. নাজমুন নূরসহ অন্তত চারজন পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে আন্দোলনকারী পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হওয়ার দাবি করা হয়। পরে তারা পটিয়া থানার সামনে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দফায় দফায় হামলা চালিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দখলের সঙ্গেও সমন্বয়ক পরিচয়ে রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন বলে সাংবাদিকদের অভিযোগ রয়েছে। পরে সেখানে জুয়া ও হাউজি চালু করা হলে প্রশাসনের নির্দেশে সম্প্রতি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রদল নেতা রিদুয়ান সিদ্দিকীকে সামনে রেখে একটি চক্র হয়রানিমূলক এই মামলা দায়ের করেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংবাদিকদের প্রধান তিনটি সংগঠন। তারা অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার এবং কথিত সমন্বয়ক রিদুয়ান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি শহীদ উল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি সালাহউদ্দিন মো. রেজা ও সাধারণ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।

যুক্ত বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও আগের মতোই বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চক্রান্ত করছে সুযোগসন্ধানী একটি চক্র।’ যে কোনো মূল্যে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

সিপি

ksrm