চট্টগ্রামে গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা, ‘খুন’ করে অপমৃত্যুর ছক
গলায় দাগ, মামলার নথিতে সুরুতহাল রিপোর্ট দেয়নি পুলিশ
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে এক গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন ‘মাথা ঘুরে পড়ে মৃত্যুর’ কথা বললেও তার গলায় দেখা গেছে দাগ। একইসঙ্গে এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। মামলার আলামতে মাথা ঘুরে পড়ে মৃত্যুর কথা লেখা হলেও গলায় দাগের কথা উল্লেখ নেই। এমনকি মামলার নথির সঙ্গে সুরুতহাল রিপোর্টও দেওয়া হয়নি।
গৃহবধূর পরিবারের দাবি, তাদের মেয়েকে খুন করা হয়েছে। বিয়ের পর থেকেই তাদের মেয়ের ওপর চালানো হতো নির্যাতন, কখনও সে সুখে ছিল না। এছাড়া পুলিশ লাশ তাদের হেফাজতে নেওয়া কথা বলে স্বাক্ষর নেয়। কিন্তু সুরুতহাল রিপোর্টে গলায় দাগের কথা উল্লখ করেনি।
গৃহবধূর বাবা নিরক্ষর হওয়ায় পুলিশের স্বাক্ষর করা কাগজে কি লেখা ছিল, তা জানতে পারেননি। পরে আদালতে গিয়ে জানতে পারেন, মাথা ঘুরে পড়ে মারা গেছে মর্মে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়।
জানা গেছে, ২০২১ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির খিরাম ইউনিয়নের দোয়াপাড়ার মিতু দাশের সঙ্গে বিয়ে হয় একই এলাকার দুলাল কুমার দাশের ছেলে ছোটন কুমার দাশের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য মারধর করতেন স্বামী। এছাড়া তার স্বামী ছিলেন পরনারী ও মাদকে আসক্ত। এসবকাণ্ডে গ্রাম্য সালিশে মুচলেকাও দিয়ে ছাড়া পান তিনি। এরপরও শুধরায়নি তার পরনারীতে আসক্তের নেশা।
মিতুর মা-বাবা জানান, এর মাঝেই তাঁদের সংসারে আসে কন্যা শিশু। সংসারে সন্তান এলেও, থামেনি মিতুর ওপর নির্যাতন। এ নিয়ে দুই পরিবারের বৈঠকও হয়, কয়েকবার। এসবের মধ্যেই জানা গেল, পরকীয়ায় জড়িয়েছেন ছোটন। মোবাইলেও চলে, বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে প্রেমালাপ। এ নিয়ে পরিবারে বাড়ে অশান্তি, বাড়ে মিতুর ওপর নির্যাতন। ৬/৭ মাস আগেও মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে সালিসি বৈঠক বসাতে বাধ্য হয় মিতুর পরিবার। সেখানে পরকীয়ার কথা স্বীকার করেন ছোটন। স্বীকার করে যৌতুক চেয়ে নির্যাতনের কথাও। ভবিষ্যতে এসব আর করবে না বলে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন ছোটন।
মিতুকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে তারা বলেন, ১ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় মায়ের সঙ্গে কথা হয় মিতুর। তখন নিশ্চিত হওয়া যায় মেয়ে সুস্থ। কিন্তু সন্ধ্যায় তার বাবার মোবাইলে ফোন দিয়ে, মাথা ঘুরে পড়ে মিতু অজ্ঞান হয়ে গেছে বলে জানান শ্বশুর দুলাল কুমার দাশ। মিতুকে ফটিকছড়ি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
মেয়ের অসুস্থতার খবরে পাগলের মতো ছুটে যান বাবা স্বপন কুমার দাশ ও মা মিনু রাণী দাশ। সেখানে গিয়ে মেয়ের নিথর দেহ টলিতে পড়ে থাকতে দেখেন। এসময় তার গলায় একটি দাগ দেখে পুলিশকে খবর দিলে, তারা এসে লাশ থানায় নিয়ে যায়।
পরে থানায় গেলে হত্যা মামলা নিতে অপারগতা জানায় পুলিশ। অপমৃত্যু মামলা হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেখে প্রয়োজনে হত্যা মামলা নিবে।
মিতুর বড় বোন শিপ্রা দাশ বলেন, আমার বোনের মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো কোনো রোগ ছিল না। লাশ উল্টাতে গিয়ে মিতুর গলার নিচে একটি দাগ দেখি। বিষয়টি পরিবারের অপর সদস্যদের জানাতে গেলে, আমাকে বাধা দেয় মিতুর শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এটি জানাজানি হলে পুলিশ লাশ নিতে এবং দাহ করতে দিবে না বলে ভয় দেখান তারা।
শিপ্রা দাশের স্বামী নিতাই দাশ বলেন, মিতুর গলায় দাগ পাওয়া গেলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই লিটন চাকমা সুরতহাল রিপোর্টে তা লিখেননি। এজন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার লাশের ময়নাতদন্ত করতে চাননি। পরে লাশ নিয়ে আসা কনস্টেবলের ফোন পেয়ে এসআই লিটন চাকমা এসে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় ডাক্তার তাকে রুমে নিয়ে গিয়ে একটি মেশিনে গলায় দাগের চিহ্ন দেখান এবং পরে লাশের ময়নাতদন্ত করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ফটিকছড়ি থানার এসআই লিটন দাশ বলেন, সুরতহাল রিপোর্টে গলায় দাগ থাকার বিষয়টি লেখা হয়েছে। ওইদিন ডাক্তারের কথা না বুঝে কনস্টেবল আমাকে মেডিকেল যেতে বলেছিলেন। পরে ডাক্তারও তা আমাকে জানিয়েছেন।
মামলার নথিতে সুরাতহাল রিপোর্ট না থাকা এবং মাথা ঘুরে পড়ে মৃত্যু দেখানোর কারণ জনাতে চাইলে এসআই লিটন বলেন, সুরাতহাল রিপোর্ট মামলার প্রতিবেদনের সঙ্গে দেওয়া হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে মাথা ঘুরে পড়ে অজ্ঞান হওয়ার বিষয়টি বলায়, তা আদালতে মামলার নথিতে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো সমস্যা হবে না।
মামলা না নেওয়ার বিষয়ে মিতুর পরিবারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তখন হত্যার কোনো প্রমাণ কেউ দিতে না পারায় অপমৃত্যু মামলা নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার আলামত আসলে মামলা নেওয়া হবে, এটাই নিয়ম।
এনইউএস/ডিজে