অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বন্দর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন মাহমুদসহ চার পুলিশ সদস্যর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন মো. কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। আদালত অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।
বুধবার (১৯ অক্টোবর) চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে মামলাটি করেন কামরুল। তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।
মামলার আসামিরা হলেন বন্দর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বর্তমানে সিটিএসবিতে কর্মরত ওসি মহিউদ্দিন মাহামুদ (৫৫), আকবর শাহ থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত মো. রবিউল ইসলাম (৫০), সিলেটে এবিপিএনে কর্মরত কেএম জান্নাত সজল (৩৫), সিলেটে কর্মরত পুলিশ সদস্য মঙ্গল বিকাশ চাকমা (৪৭), পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার সবুজ নগর ইউনিয়নের মো. চাঁন মিয়া ফরাজীর দুছেলে মো. জামাল ফরাজী (৪৭) ও মিলন ফরাজী।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরে মো. জামাল ফরাজীর ‘দিশা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সমিতিতে মাসিক ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১৩ জুলাই থেকে কামরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন মিলে নিয়মিত টাকা জমা রাখতেন। ২০১৬ সালের জুনে তারা দিশা ফাউন্ডেশেনের কার্যালয়ে গিয়ে দেখে প্রতিষ্ঠানটি উধাও হয়ে গেছে। পরে সমিতির সদস্যরা মিলে প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. জামাল ফরাজীর কাছে গেলে তিনি এক বছরের মধ্যে ২৮টি জমা বইয়ের সদস্যেদের মোট দুই লাখ ৯১ হাজার ৯০৬ টাকা ফেরত দেবে বলে লিখিত দেন।
এদিকে ২০১৮ সালের ৮ জুন টাকা চাইতে দক্ষিণ মধ্য হালিশহর ইছহাক ডিপোর সামনে গেলে জামাল ফরাজী, মিলন মাঝি, মো. বাদশা, আবদুর রহিম, আওলাদসহ আরও ৪-৫ জন মিলে কামরুল ইসলামের ওপর হামলা করেন। এ সময় তাকে মারধর করে হাতে থাকা সমিতির আরও তিনটি জমা বই কেড়ে নেন। ওইদিন ঘটনাস্থলে তৎকালীন বন্দর থানার এসআই মো. রবিউল ইসলাম পেট্রোল ডিউটিতে থাকলেও রহস্যজনকভাবে তাদের কোনো সহযোগিতা করেননি।
পরে ১১ জুন কামরুল ইসলাম হাসাপাতাল থেকে ফিরে বন্দর থানায় মামলা করতে গেলে এসআই রবিউল মামলা না নিয়ে উল্টো গালিগালাজ করে তাকে বের করে দেন। এ সময় তাকে বাড়াবাড়ি করেতেও নিষেধ করেন। পরে কামরুল একটি সিআর মামলা করেন, যা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ১-এ বিচারাধীন।
২০১৮ সালে ১৩ ডিসেম্বর কামরুল ইসলাম মামলার ওয়ারেন্ডভুক্ত আসামিদের ধরতে অনুরোধ করতে বন্দর থানায় গেলে তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন মাহামুদ তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ সময় তিনি বাদিকে ২৪ ঘণ্টর মধ্যে মামলা তুলে নিতে বলেন। মামলা তুলে না নিলে পরিণাম ভয়াবহ হবে বলে জানিয়ে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন। এরপর মামলা প্রত্যাহার না করায় ওইদিন কামরুল ইসলামকে বন্দর থানায় মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেন।
এরপর ২০১৯ সালে ১০ জানুয়ারি তৎকালীন বন্দর থানায় কর্মরত এসআই কেএম জান্নাত একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে কামরুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যান। এরপর তাকে হাতকড়া পরিয়ে, মুখে কালো কাপড় বেঁধে বিভিন্ন স্থানে ঘুরাতে থাকেন। সেদিন আনুমানিক রাত ১২টার দিকে তাকে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে নিয়ে চোখ খুলে দিলে সেখানে ওসি মহিউদ্দিন মাহামুদ ও জামাল ফরাজীকে দেখতে পান। এ সময় ওসি মহিউদ্দিন মাহামুদ তার কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও জামাল ফরাজীর কাছে কোনো টাকা পাবে না বলে লিখিত দিতে বলেন। না দিলে তাকে গুলি করে জান্নাতের মেহমান বানিয়ে দেবে বলে হুমকি দেন। এস ময় হঠাৎওসি মহিউদ্দিন মাহমুদের মোবাইলে কল এলে কামরুল ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
তাকে গুলি করে মারতে না পেরে আক্ষেপের সুরে ওসি মহিউদ্দিন মাহামুদ ওইসময় বলেন, ‘শালাকে মারা যাবে না, গাড়িতে তোল, গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে আস। পরে তাকে থানায় আনা হয়। সেই মামলায় চারদিন পর জামিন নেন কামরুল।
কামরুল ইসলাম ১৭ জানুয়ারি মামলার বিষয়ে কথা বলতে থানায় গেলে ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘শালা তুই জামিন পাইলি কেমনে? আমিতো তোকে সারা বাংলাদেশের থানায় থানায় মামলায় জড়াব’—একথা বলে তাকে থানা থেকে বের করে দেন।
মামলায় কামরুল ইসলামের কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে তাকে রেহাই দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দিলে তারা নারাজি দেয়। পরে মামলাটি গোয়েন্দা শাখায় হস্তাস্তর করা হয়। পুনঃতদন্তেও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে প্রতিবেদন দিলে তা আদালত গ্রহণ করেন। এরপরও তাকে বন্দর থানার একটি মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান মহিউদ্দিন মাহমুদ।
এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল পুলিশ সদস্য মঙ্গল বিকাশ চাকমা এবং দুইভাই জামাল ফরাজী ও মিলন ফরাজীকে তলব করেন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার। পরে মঙ্গল বিকাশ চাকমাকে সিলেট বিভাগে বদলি করা হয়।
আইএমই/ডিজে