জার্মানিতে রাষ্ট্রপতির সফরে এক ভুলের মাশুল পৌনে ২ কোটি টাকা, রাষ্ট্রদূতের আনন্দভ্রমণেই খরচ ৩৭ লাখ
বিদেশে রাষ্ট্রের টাকা লুটের মহোৎসব
সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের জার্মানি সফরকে কেন্দ্র করে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে, যার অঙ্ক সুদে-আসলে আরও বাড়ছে। জার্মানির একটি আদালতের রায়ে এই বিশাল অঙ্কের অর্থদণ্ড এখন রাষ্ট্রের কাঁধে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বর্তমান রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নাইনের বিরুদ্ধে পরিবার সঙ্গে না থাকলেও ভাতার টাকা তোলা এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দেশটির রাজধানী বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু কর্মকর্তার উদাসীনতায় সৃষ্ট এই অর্থদণ্ডে কূটনৈতিক মহলেও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চুক্তির ফাঁদে রাষ্ট্রীয় সফর
২০২২ সালের ১২ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত জার্মানি সফরের কথা ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের। সফরে রাষ্ট্রপতি ও তার বহরের যাতায়াতের জন্য বার্লিনের এসএটি জিএমবিএইচ সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের সঙ্গে ১০ অক্টোবর ১ লাখ ৯২ হাজার ৩২৭ ইউরো মূল্যের চুক্তি করে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস। ১২ দিনের জন্য ২৩টি গাড়ি সরবরাহের এই চুক্তিতে কোনো ‘এক্সিট রুট’ বা ‘ক্যান্সেশন ক্লজ’ রাখা হয়নি। ফলে একবার চুক্তি স্বাক্ষরের পর সেটি বাতিলের কোনো সুযোগ ছিল না। সে সময় বার্লিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

নথিতে দেখা যায়, এই চুক্তির আওতায় ছিল ১টি অডি এ৮ সিকিউরিটি, ২টি মার্সিডিজ ভি-ক্লাস, আরও ৮টি মার্সিডিজ ভি-ক্লাস, ৯টি সেডান, ২টি এসইউভি এবং ১টি লাগেজ ট্রান্সপোর্টার। গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট সেবাসহ মোট ব্যয়ের মধ্যে মূল ভাড়া ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৬২০ ইউরো এবং ১৯ শতাংশ ভ্যাট ৩০ হাজার ৭০৭ দশমিক ৮০ ইউরো।

বাতিল, নতুন চুক্তি ও দ্বিগুণ ব্যয়
পরবর্তীতে সফরের সময়সূচি পরিবর্তন হলে এসএটি থেকে আর গাড়ি নেয়নি দূতাবাস। একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২৯ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত নতুন করে ৮ দিনের জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ১০ দশমিক ৪০ ইউরোর আরেকটি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এতে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে শতভাগ অগ্রিম পরিশোধের শর্ত ছিল এবং আগের চুক্তির অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি নতুন সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এরপর বিকল্প হিসেবে বিজি ট্যাক্সি আইটি সার্ভিস জিএমএইচ থেকে গাড়ি নেওয়া হয়। ২৪ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দিনে পরিবহনসেবা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৮২ দশমিক ৩৪ ইউরো বিল করে, যার মধ্যে ৫০ হাজার ইউরো অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। ফলে একই সফরের জন্য একদিকে প্রথম চুক্তির অর্থ বকেয়া থেকে যায়, অন্যদিকে নতুন করে দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যয় যুক্ত হয়।
আদালতে মামলা, রায়ে বাড়ল দায়
চুক্তি অনুযায়ী পাওনা আদায়ে এসএটি বাংলাদেশকে বিবাদী করে জার্মানির ল্যান্ডগেরিখট মেমিংগেন আদালতে মামলা করে। ২০২৩ সালে দায়ের হওয়া এই মামলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। ২০২৪ সালে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগও কাজে লাগানো হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আপিলের সুযোগ থাকলেও সেটিও হাতছাড়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী পেট্র কোটেকের টাইমশিটে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে মামলার নথি পর্যালোচনা, জবাব প্রস্তুত, শুনানির প্রস্তুতি, ফোনকল ও ইমেইল আদান-প্রদান চলছিল নিয়মিতভাবে। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মৌখিক শুনানির পর আদালত বাংলাদেশের বিপক্ষে রায় দেয়।
রায়ে এসএটিকে ৮৮ হাজার ১১২ ইউরো, প্রি-লিটিগেশন ও আইনজীবী খরচ ২ হাজার ৪২২ ইউরো এবং আদালতের খরচ ৩৩১ ইউরো পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রযোজ্য সুদ যুক্ত হয়। একই সঙ্গে দূতাবাস নিয়োজিত আইনজীবীর ৮ হাজার ১১০ ইউরো ফি যোগ হয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট দায় দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার ৭২০ ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এখনো এই অর্থ পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে অঙ্ক আরও বেড়েছে।
আপিল নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা
রায়ের পর ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আপিলের সুযোগ থাকলেও প্রায় এক মাস কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকে। পরে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক নোটে আপিলের পরিবর্তে জরিমানা পরিশোধের জন্য অর্থ ছাড়ের আবেদন করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, হেড অব চ্যান্সেরি তানভির কবীরের গাফিলতিতে এই আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এ চুক্তি হয়েছে। তৃতীয় একজন আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী, চুক্তি বাতিলের সুযোগ না থাকায় আপিল করেও এই মামলা জেতা সম্ভব নয়। তাই আপিল না করে জরিমানা পরিশোধ করাই শ্রেয়। এটি আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, মন্ত্রণালয় থেকেই মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
পরবর্তীতে জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়াই তিনি আদালতে আপিল দায়ের করেন এবং রাষ্ট্রদূতের অনুমতিও নেননি। পরে তা প্রত্যাহার করা হয়, যা অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়েছে।
রাষ্ট্রদূতের ভাতা ও ভ্রমণ বিতর্ক
এদিকে ২০২৫ সালের মার্চে আলজেরিয়া থেকে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দেন মোহাম্মদ জুলকার নাইন। বিসিএস ১৭ ব্যাচের এই কর্মকর্তা বার্লিনে যোগ দিলেও তার সহধর্মিণী ও দুই সন্তান এখনো সেখানে যাননি। তবু তাদের জন্য বৈদেশিক বদলি খরচ বাবদ ২১ হাজার ২৭২ ইউরো, অর্থাৎ ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ টাকা উত্তোলন করেছেন তিনি।
নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা যোগ দিলে এই ভাতা প্রাপ্য। যোগদানের ছয় মাসের মধ্যে তারা না এলে উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এক বছরের বেশি সময় পার হলেও পরিবারের সদস্যরা বার্লিনে যাননি এবং উত্তোলিত অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের জুনে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা খাতে ২ হাজার ৯৬৮ ইউরো, অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ২৬ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে, যদিও তৃতীয় দেশে অবস্থানরত স্বজনদের জন্য এ ভাতা প্রযোজ্য নয়।
একই বছরের মার্চ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে রাষ্ট্রদূত ১৪ বার জার্মানির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন গন্তব্যে সফর করেন। এসব সফরে ভ্রমণ ভাতা বাবদ ৩৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৬ টাকা উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সফর অপ্রয়োজনীয় ছিল এবং এক দিনের কাজকে চার বা পাঁচ দিনের সফর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
একই সময়ে ফ্রাংকফুর্ট, মিউনিখসহ বিভিন্ন শহরে বাজেট সংকটের কারণে ই-পাসপোর্ট সেবা বন্ধ রাখা হয়, ফলে প্রবাসীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তবে প্রশাসনিক সফরে কোনো কাটছাঁট হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার, দায় চাপানোর পাল্টাপাল্টি
অভিযোগ অস্বীকার করে রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন বলেন, ‘যেসব সফর করেছি, সেগুলো প্রয়োজনীয়। জার্মানির বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বার্লিনে নয়, বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে আছে। কাজের প্রয়োজনে সেখানে যেতে হয়েছে। অন্য অনেক রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তার তুলনায় কম সফর করেছি।’ পরিবারের জন্য উত্তোলিত ভাতাও নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন ও হেড অব চ্যান্সেরি তানভির কবীর দাবি করেন, দূতাবাসের একটি গোষ্ঠী তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে। তাদের ভাষ্য, কর্মকর্তাদের অনিয়মে সম্মতি না দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক নীরবতা ও প্রশ্নের মুখে জবাবদিহি
পুরো ঘটনাপ্রবাহে ২০২২ সালের চুক্তি থেকে শুরু করে আদালতের রায়-পরবর্তী সময় পর্যন্ত একাধিক ধাপে সিদ্ধান্তগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। আপিলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা কাজে না লাগানো, পরে আবার অনুমতি ছাড়াই আপিল করে প্রত্যাহার—সব মিলিয়ে আর্থিক দায় আরও বেড়েছে।
বাংলা আউটলুকে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তানভির কবীরের বিরুদ্ধে সরকারের নির্দেশ অমান্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বদলির নির্দেশের প্রায় ১৪ মাস পরও তিনি বার্লিনে অবস্থান করছেন এবং দূতাবাস ভবন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ওই প্রকল্প ঘিরেও অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। একজন সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও অগ্রগতি স্পষ্ট নয়। একটি সূত্র জানায়, ওই কর্মকর্তা তানভির কবীরকে অন্তত আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বার্লিনে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক দায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার।
সিপি



