টানেলে ৫৮৫ কোটির লুটপাটে ওবায়দুল কাদেরের নাম, স্বপ্নের প্রকল্প এখন গলার কাঁটা

২২ মাসে আয় ৬৭ কোটি, খরচ ২০৬ কোটি

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল প্রকল্পে অনুমোদিত পরিকল্পনার বাইরে তিনটি খাত দেখিয়ে ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অপচয়ের অভিযোগে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শতাধিক দুর্নীতির মামলার মধ্যে এটিই প্রথম যেখানে ওবায়দুল কাদের সরাসরি আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হলেন।

প্রকল্পবহির্ভূত তিন খাতে অপচয়

দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন (প্রতিরোধ) বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, টানেল প্রকল্পে অসৎ উদ্দেশ্যে ‘পরিষেবা এলাকা’, ‘পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার’ এবং ‘একটি টাগবোট’ খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় তিনটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এগুলোর কোনো সুপারিশ না থাকার পরও এই খাতে ৫৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ) ব্যয় দেখানো হয়েছে।

মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও আসামি করা হয়েছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদসচিব) খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমদ এবং সাবেক পরিচালক আলীম উদ্দিন আহমেদকে।

টানেলের আয়-ব্যয়ে বড় ধরনের অমিল

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, টানেলের রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিমাসে গড়ে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২২ মাসে এই খাতে খরচ হয়েছে ২০৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, অথচ রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৬৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সরকারের লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা।

প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি এবং ২০২২ সালে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভ্রান্ত পূর্বাভাস

২০১০ সালে শেখ হাসিনার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক দরপত্রে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (চায়না)-অরুপ হংকং জেভিকে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের আগস্টে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, টানেল নির্মিত হলে ২০২৫ সালে বছরে ১০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন যানবাহন টানেল ব্যবহার করবে।

কিন্তু বাস্তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২২ মাসে টানেল ব্যবহার করেছে মাত্র ২৪ লাখ ৫৫ হাজার যানবাহন, যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৩ শতাংশ।

ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব

২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে এক জনসভায় শেখ হাসিনা কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের ঘোষণা দেন। পরের বছর বরাদ্দবিহীনভাবে প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ সমীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, টানেল হলে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর এবং আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হবে। বাস্তবে না বন্দর হয়েছে, না গড়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল।

অভিযোগ রয়েছে, টানেল অনুমোদনের আগেই তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর সহযোগীরা প্রকল্প এলাকায় কম দামে জমি কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করে আর্থিক ফায়দা নেন।

অসংখ্য নথি ও অনিয়ম

তদন্তে দেখা যায়, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যেখানে এক বা দুটি নথি থাকার কথা, সেখানে টানেল প্রকল্পে ৩৮টি পৃথক নথি চালু করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, অসৎ উদ্দেশ্যে আলাদা নথি তৈরি করে দুর্নীতির সুযোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদেশি ও দেশি বিশেষজ্ঞরা আলাদা তিনটি প্রতিবেদন জমা দেন। থাইল্যান্ডের সোলভান অ্যাসোসিয়েটস, ভারতের সাইবার সিটি ফেজ ম্যানেজার মাইকেল কাস্টনার এবং গাজীপুর ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. হোসেন মো. শাকিন—কেউই পরিষেবা এলাকা, সফটওয়্যার বা টাগবোট অন্তর্ভুক্তির পরামর্শ দেননি। তবুও এসব খাত অন্তর্ভুক্ত করে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়।

‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে প্রকল্প

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, কর্ণফুলী টানেল এখন সরকারের জন্য ‘গলার কাঁটা’। তাঁর ভাষায়, ‘এটা চৌবাচ্চায় হাঙ্গর লালনের মতো। কোটি কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্র প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না।’

তদন্তের অগ্রগতি

দুদকের উপপরিচালক মো. সিরাজুল হকের নেতৃত্বে মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, চার্জশিট দাখিলের আগে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শেখ হাসিনাসহ একনেক কমিটির সদস্যদেরও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

কলকাতার অভিজাত এলাকায় ওবায়দুল কাদের

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর ওবায়দুল কাদের ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে বর্তমানে তিনি কলকাতার অভিজাত রাজারহাট নিউটাউনের ডিএলএফ নিউটাউন হাইটস প্লাজায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। নিউটাউন হাইটস প্লাজা একটি হাইরাইজ কমপ্লেক্স যেখানে অত্যাধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। তিনি সেখানে স্ত্রীসহ অবস্থান করছেন। খুব একটা বাইরে বের হন না।

জানা গেছে, তার থাকার ফ্ল্যাট ভাড়াসহ নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যাবতীয় খরচ বহন করছেন সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী। নিজাম হাজারী নিজেও একই কমপ্লেক্সের আরেক ফ্ল্যাটে থাকছেন। একই ভবনে অবস্থান করছেন টাঙ্গাইল-২ আসনের সাবেক এমপি ছোট মনিরও।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm