বাঁশখালীতে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে রক্তাক্ত রাত: মসজিদে শুরু, বাজারে রণক্ষেত্র
আহত ১৬, রগ কাটা গেল ছাত্রদল নেতার
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিএনপি-ছাত্রদল এবং জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিকেলের পর রাত অবধি গড়ানো সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে দুই পক্ষ দাবি করেছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের একজন বাঁশখালী উপকূলীয় কলেজ ছাত্রদল নেতা তায়েব, যার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে পশ্চিম বাঁশখালী দারুল ইসলাহ মাদ্রাসায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্লাস শেষ হওয়ার পর মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ এলাকায় ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মীর মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে শিবিরের অন্তত তিনজন আহত হন। গুরুতর আহত জামায়াত সমর্থিত শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কর্মী রাকিবকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এই ঘটনার জেরে রাত ৯টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নের মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাজারের পূর্বপাশে বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এবং অপর প্রান্তে স্কুল রোডে জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। কিছু সময় পরই দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ছাত্রশিবির কর্মী শওকতকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে বাঁশখালী উত্তর শাখার সেক্রেটারি আজগর হোসাইনও রয়েছেন। অপরদিকে ছাত্রদলের দাবি, হামলায় তাদের আট-নয়জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে বাঁশখালী উপকূলীয় কলেজ ছাত্রদল নেতা তায়েব গুরুতর আহত। তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়।
সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি টিম ঘটনাস্থলে যায়। তারা দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করলে পুলিশের ওপর মৃদু হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ মিলেছে। তবে ছাত্রদল নেতারা অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেন, ‘সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে হয়তো ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, ইচ্ছাকৃত হামলা নয়।’
রাতে বাহারছড়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হাসান আজাদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, মাদ্রাসা ছুটির পর পাশের মসজিদে কুরআন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এ সময় ছাত্রদলের কয়েকজন ছেলে গিয়ে তাদের বলে, এখানে কোনো মিটিং করা যাবে না। এ সময় তারা ২-৩ জনের ওপর হামলা চালায়। এর মধ্যে গুরুতর আহত রাকিব নামের একজন কর্মীকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।’
জামায়াত নেতা হাসান আজাদ বলেন, ‘রাত ৯টার দিকে বাজারে গিয়ে আমি দুই পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থান নিতে দেখার পর আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সরিয়ে দিই। কিন্তু ১০-১২ মিনিট পর বিএনপি-ছাত্রদলের লোকজন বাজারের মিলের গাছ সঙ্গে করে নিয়ে এসে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত শিবিরকর্মী শওকতকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছাত্রশিবির বাঁশখালী উত্তর শাখার সেক্রেটারি আজগর হোসাইনও আহত হয়েছেন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে মাদ্রাসা এলাকায় হামলার ঘটনায় ছাত্রদলকর্মী নয়ন ও তানভীরের নেতৃত্বে ১০-১২ জন জড়িত ছিলেন।
বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রদল নেতা ফরহাদ হোসেন আসিফ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘দারুল ইসলাহ মাদ্রাসায় ক্লাশ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সেখানে গিয়ে অবস্থান নেয় শিবিরের কিছু নেতাকর্মী। ওই মাদ্রাসা থেকে জামায়াত-শিবিরের সবরকম কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হোসাইন নিজেও জামাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মাদ্রাসাপড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী সেখানে আগে থেকেই ছিল। ফেরার পথে তাদের উদ্দেশ্যে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে কথাকাটাকাটি এবং সামান্য হাতাহাতি হয়। এতে একটি ছেলে সামান্য আহত হয়।’
ছাত্রদল নেতা আসিফ বলেন, ‘বিকেলের ঘটনার পর জামায়াত-শিবিরের নেতারা বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নেতাকর্মীদের জড়ো করে বাহারছড়া মিয়ার বাজারে নিয়ে আসে। রাতে তারাই বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসে তাদের প্রতিরোধ করে। জামায়াত-শিবিরের হামলায় আমাদের ৮-৯ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় কলেজ ছাত্রদল নেতা তায়েবের পায়ের রগ কেটে দিয়েছে তারা। আহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাবেক সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকও আছেন।’
বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির আহবায়ক লোকমান আহমদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি ঘটনার বিস্তারিত কিছু জানি না। রাতে যখন ঘটনা শুনি, তখন আমাদের নেতাদের অনুরোধ করি বিষয়টি সমাধান করে দিতে।’
সিপি