বিবাহিত ও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত কেউ ছাত্রলীগের কমিটির পদ পাবে না— ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে এমন কথা লেখা থাকলেও চট্টগ্রামের পটিয়া কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে নিয়েছেন বিবাহিত ও সন্ত্রাসী হিসেবে স্থানীয়ভাবে কুখ্যাতরাই। এমনকি সেই কমিটিতে আছে অভিযুক্ত ধর্ষকও। দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সরাসরি আনুকূল্যে এরা পদগুলোতে বসেছেন— এমন অভিযোগ পটিয়া ছাত্রলীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
পটিয়া কলেজ ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শাহাদাত হোসেন। গত ১০ জুলাই পটিয়া উপজেলার ছনহরা ইউনিয়নে এক তরুণীকে দিনভর আটকে রেখে ‘বীরদর্পে’ ধর্ষণ করেন তিনি। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছুরি দিয়ে কিশোরীর স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে জখম করে হত্যার চেষ্টা করে পালিয়ে যান। ওই ঘটনার পর ১৬ দিন লুকিয়ে থেকে ২৬ জুলাই ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলায় র্যাবের হাতে আটক হন শাহাদাত।
ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাতের কীর্তি এখানেই শেষ নয়। পটিয়া কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার মাসদুয়েক আগে তিনি বিয়ে করেন। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসামাজিক কাজ করতে গিয়ে এলাকাবাসীর হাতে হাতেনাতে আটক হওয়ার পর তিনি সামাজিকভাবে বিয়ে করতে বাধ্য হন। তার সেই বিয়েতে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের একাধিক নেতাও দাওয়াত খেতে এসেছিলেন বলে জানান স্থানীয়রা।
অন্যদিকে পটিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হান্নান নিজেই অস্ত্রমামলার পলাতক আসামি। পটিয়া থানায় দায়ের করা সেই অস্ত্রমামলার (মামলা নং ৩৬) প্রধান আসামিই এই হান্নান। জানা গেছে, পটিয়া কলেজের কমিটি ঘোষণার আগে ২১ মে ছনছরা ইউনিয়নে বস্তাভর্তি অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় এক সহযোগীসহ এলাকাবাসীর হাতে আটক হন হান্নান। বস্তাভর্তি অস্ত্র দেখে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দিলে কৌশলে পালিয়ে যান হান্নান। তবে পুলিশ হান্নানকে আটক করতে না পারলেও পুলিশ বাদী হয়ে পটিয়া থানায় একটি অস্ত্র মামলা দায়ের হয়। সেই মামলায় কাগজেকলমে পলাতক রয়েছেন সাধারণ সম্পাদক হান্নান। তবে এলাকায় হাঁটছেন বুক ফুলিয়ে। এলাকার এক প্রভাবশালী যুবলীগ নেতার স্নেহধন্য হান্নানকে সাধারন সম্পাদকের পদটি ওই যুবনেতার প্রভাবেই অনেকটা নিরূপায় হয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা— জানা গেছে এমন কথাও।
তবে হান্নান ও শাহাদাত দুজনই আবার দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অস্ত্রমামলার আসামি হান্নানের পক্ষ নিয়ে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, ‘মামলা তো থাকতেই পারে, অস্ত্রমামলা আছে তাতে কী? সে তো আর অপরাধী না। এটা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা।’
অন্যদিকে ধর্ষণের ঘটনায় আটক শাহাদাতের বিষয়ে আরও একধাপ এগিয়ে তিনি বললেন, ‘এই শাহাদাত ধর্ষক শাহাদাত না। এটা অন্য কেউ।’
পটিয়া কলেজের শাহাদাতই যে ধর্ষক শাহাদত— সে ব্যাপারে তাকে প্রমাণ দেওয়া হলেও তাহের সেটা মানতে রাজি হননি।
এদিকে হান্নান তার নামে ছড়ানো বিভিন্ন অভিযোগকে অপবাদ ও মিথ্যা বলে অভিহিত করে তার নামে কোনো মামলা নেই বলে জানালেও পুলিশ জানিয়েছে ভিন্ন কথা।
এ ব্যাপারে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম টিটু চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, অস্ত্রমামলাটি এখনও তদন্তাধীন আছে।
অস্ত্রমামলার আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কেন তাকে আটক করছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আমরা তাকে খুঁজতেছি। সে এলাকাতে নেই। পেলেই আটক করবো।’
২৫ জুন একদিনে ছাত্রলীগের সাতটি ইউনিট কমিটির অনুমোদন দিয়ে আলোড়ন তৈরি করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগ। দীর্ঘদিন পর কমিটি পেয়ে যেমন অনেকে করেছেন উল্লাস, বিপরীতে আবার ক্ষোভ আর আন্দোলনও কম ছিল না। তাদের অনেকে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য, সন্ত্রাসী ও বিবাহিতদের কাছে ছাত্রলীগের পদ বিক্রির অভিযোগ করা করেন। অনেকে আবার টাকা দিয়েও পদ পাননি। তাই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে টাকা ফেরত পোস্ট দিয়েছেন ফেসবুকে— ঘটেছে এমন ঘটনাও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির এক নেতা বলেন, ‘জেলা ছাত্রলীগের নেতারা জেনেশুনেই অযোগ্যদের পদ দিয়েছে মোটা টাকার বিনিময়ে। যেখানে শুধুমাত্র ছাত্রদের হাতেই ছাত্রলীগ তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীই, সেখানে তারা টাকার কাছে নীতি বিসর্জন দিয়ে যাকে-তাকে পদে বসাচ্ছে।’
ওই নেতা বলেন, ‘দক্ষিণ জেলার সভাপতি নিজেই তো ছাত্রলীগ নন, তিনি ছাত্রসেনা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন ছাত্রলীগে। তিনি কী করে বুঝবেন ছাত্রলীগ কর্মীদের দুঃখ।’
তবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম বোরহান বলেন, ‘হান্নান যে অস্ত্র মামলার আসামি এবং শাহাদাত যে বিবাহিত— তা আমরা জানতাম না। এখন জেনেছি। যদি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যখন নামগুলো পাঠানো হয় তখন আমরা দেখি কারও কোনো দুর্নাম আছে কিনা। সে সময় হয়তো তারা তাদের কুর্কমগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, তাই আমরা জানতে পারিনি।’
অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে কমিটি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বোরহান বলেন, ‘আমরা টাকার বিনিময়ে কমিটি দিয়েছি এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। আর যদি কারো কাছে প্রমাণ থাকে তাহলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’
সিপি