s alam cement
আক্রান্ত
৮১২১৭
সুস্থ
৫৫২০৮
মৃত্যু
৯৫৮

বাবাকে বাঁচাতে চট্টগ্রামের ৪ হাসপাতালে ১২ ঘন্টার যুদ্ধ কিশোর ছেলের

মেডিকেলে ভর্তি হয়ে অক্সিজেন চাইতে হল ফেসবুকে

0

করোনার চিকিৎসায় এখন বেশিরভাগ রোগীরই প্রয়োজন হচ্ছে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন। করোনার উপসর্গ নিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগতে ভুগতে হাই ফ্লো অক্সিজেনের খোঁজে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসেছিলেন ৬০ বছরের এক বৃদ্ধ। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রামের তিনটি হাসপাতাল ঘুরে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন তো পেলেনই না। বরং শেষপর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনোমতে ভর্তি হতে পারলেও সেই রোগীর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার চাইতে হয়েছে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে। শেষ পর্যন্ত অনেকটা বিনা চিকিৎসাতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি।

তবে মৃত্যুর আগে প্রায় ১২ ঘন্টায় চট্টগ্রাম শহরে একটা আইসিইউ শয্যা অথবা নিদেনপক্ষে বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের খোঁজে এক কঠিন যুদ্ধই চালাতে হয়েছে ২১ বছরের কিশোর নিশাতকে।

সেই বৃদ্ধ বাবার যখন মুমূর্ষু অবস্থা, তখন হাই প্রেসারে অক্সিজেন পাওয়ার নিশ্চয়তা এসেছিল চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে। কিন্তু সেই হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই শেষ নিশ্বাসটি ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন নিশাতের প্রিয়তম বাবা।

বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) সকাল ১১ টার দিকে চমেক হাসপাতাল থেকে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মারা যান বাঁশখালীর ৬০ বছর বয়সী ওই পুরুষ। এর আগের দিন রাত ১১টায় চট্টগ্রামে এসেছিলেন তিনি।

শ্বাসকষ্টে ভোগা বাবাকে নিয়ে বাঁশখালী থেকে চট্টগ্রাম আসার বর্ণনা দিয়ে কিশোর নিশাত চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আমরা উনাকে বাঁশখালীর একটা ক্লিনিকে নিয়ে যাই। তারা আমাদের বলেন উনার অনেক বেশি অক্সিজেন লাগবে। এটা চট্টগ্রাম শহরে ছাড়া পাওয়া যাবে না। আমরা তখনই চট্টগ্রাম শহরের দিকে রওনা হয়ে যাই।’

চট্টগ্রাম শহরে এসে বাবাকে নিয়ে প্রথমেই ন্যাশনাল হাসপাতালে যান নিশাত। তবে শয্যা না থাকায় সেখানে বাবাকে ভর্তি করাতে না পেরে হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালের দিকে ছোটেন নিশাত। তবে মাঝপথ থেকে আবার তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন হয় জেনারেল হাসপাতালের দিকে। এই সময়ের কথা তুলে ধরে নিশাত বলেন, ‘আমরা ন্যাশনালে ভর্তি করাতে না পেরে হলিক্রিসেন্টের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে এক আত্মীয় জানালো হলিক্রিসেন্ট মূলত জেনারেল হাসপাতালেরই একটা ইউনিট। জেনারেল হাসপাতাল থেকেই সেখানে রোগী রেফার করা হয়। এজন্য আমরা জেনারেল হাসপাতালের দিকে অ্যাম্বুলেন্স ঘোরাতে বলি।’

Din Mohammed Convention Hall

তবে শেষ পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতালের বদলে বাবাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে যান নিশাত। নিশাত বললেন, ‘জিইসি পর্যন্ত আসার পর অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার বললেন, চমেক হাসপাতালে একবার গেলে ভাল হয়। আমরা সেটাতে সায় দিই। চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাই আব্বুকে।’

চমেক হাসপাতালে বেশ কয়েক ঘন্টা ছিলেন নিশাতের পিতা। এই সময়ে শুরুতে শয্যা পাওয়া যাচ্ছিল না। অক্সিজেন পাওয়া তো অকল্পনীয়। সেই সময়েই চমেক হাসপাতালে থাকা ওই রোগীর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারের সন্ধানে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিন্তু সেখান থেকে সেভাবে সাড়া পাওয়া যাযনি।

পরে হাসপাতালের বারান্দায় ছোট একটা জায়গায় ওই বৃদ্ধের বসার ব্যবস্থা করে সেখানেই একটা লাইনে অক্সিজেন দেওয়া হল। ঘটনাবহুল ওই কয়েক ঘন্টার মধ্যে ওই সময়টাতে খানিকটা ‘স্বস্তি’ পেয়েছিলেন মানুষটি। তবে তখনও তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ছিল ৫০-এর নিচে।

পরে সকালে ন্যাশনাল হাসপাতাল থেকে খবর আসে রোগীকে আইসিইউতে একটা শয্যা দেওয়া যাবে। নিশাত জানান, ‘সকাল ১০ টার দিকে ন্যাশনাল থেকে জানানো হয় একটা আইসিইউ তারা দিতে পারবে। আইসিইউ কিনা জানি না, তবে অনেক বেশি প্রেসারে অক্সিজেন দেওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়েছে— এটা শুনেই আমরা বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা দিই। উনাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা যাচ্ছিল না। দুই তিনজনে মিলে ধরাধরি করে তুলি। তবে ন্যাশনাল হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তিনি মারা যান।’

ঠিক ওই সময়েই অক্সিজেন সংগ্রহে সহায়তা চেয়ে ফেসবুকের দেওয়া পোস্টে একজন জানান, ‘দেখ তো একটু। একজন ভাইয়ার আছে বাট বাসা থেকে নিতে হবে। পারবি কিনা দেখে জানা আমাকে আর্লি।’ জানানোর আর প্রয়োজন পড়েনি। পোস্টদাতা এবার লিখলেন, ‘যার জন্য চেয়েছিলাম আংকেলটা মারা গেছেন। আর প্রয়োজন নেই।’

লাশ দাফনের খানিক পরেই সেই আব্বুর জীবনযুদ্ধের শেষ মুহূর্তের বেদনাবিধূর ছোটাছুটির বর্ণনা যখন দিচ্ছিলেন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত কিশোর নিশাত, মাঝখানে হঠাৎ একটু থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিশাতের হঠাৎ প্রশ্ন— ‘এসব কি আপনি পত্রিকায় লিখবেন? কী হবে লিখে?’

এই মুহূর্তের চট্টগ্রামে এমন প্রশ্নের উত্তর এখন কারও কাছেই নেই!

সিপি

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm