জমাদিউস সানি হিজরী সালের ৬ষ্ঠ মাস। এই মাসের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম জাহানের প্রথম খলীফা ও প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এবং সর্বশেষ নবী-রসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অনন্তসঙ্গী ও প্রিয় সাহাবি আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর ওফাত দিবস এই মাসের ২২ তারিখে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ৫৭৩ সালে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবু কুহাফা ও মায়ের নাম সালমা বিনতে সাখার। মুসলিম বিশে এই দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সব কথা ও ঘটনা সর্বপ্রথম যিনি বিনা বাক্যে এবং বিনা দ্বিধা-সংকোচে সত্য বলে স্বীকার করেছিলেন হুজুর (সা.) এর পবিত্র জবানে তাকে সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং খোদ তিনিই যাকে আফজালুল বাশার বা মানব শ্রেষ্ঠ আখ্যায়িত করেছিলেন তার পবিত্র জীবনাদর্শ আলোচনা-স্মরণ করার জন্য কোনো বিশেষ দিন-তারিখ বা সময় নির্দিষ্ট করারও প্রয়োজন পড়ে না।
সবসময়ই তার আদর্শের কথা স্মরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। তথাপি বলতে হয় আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর ওফাত দিবসটি কেবল মুসলমানদের জাতীয় পর্যায়ে নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হওয়ার দাবি রাখে। অথচ দুঃখের বিষয় এ দেশে দিবসটি প্রায় নীরবে চলে যায় লৌকিকতা প্রদর্শন হিসেবেও দিবসটির অধিকাংশ মুসলমানই কোনো খোঁজ খবর রাখে বলে মনে হয় না। সর্বশেষ নবী-রসূল (সা.) এই প্রথম মুসলমানের পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন এভাবে রসূলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করা হয় আপনার দৃষ্টিতে কে সবচেয়ে বেশি প্রিয়? তিনি বলেন হজরত আয়েশা (রা.)। লোকেরা আরজ করল আমাদের উদ্দেশ্য পুরুষদের মধ্যে কে? হুজুর (সা.) বললেন তার (আয়েশার রা.) পিতা, রসূলুল্লাহ (সা.)প্রায় বলতেন যারা আমার প্রতি কোন প্রকারের এহসান বা উপকার করেছে আমি তাদের প্রতিদান দিয়েছি হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ব্যতীত। আমার উপর তার বিরাট উপকার রয়েছে তার প্রতিদান কেয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহতালা দেবেন।
রসূলুল্লাহ (সা.)এর উল্লিখিত বক্তব্যের ব্যাখ্যা তার অপর একটি উক্তিতে বিদ্যমান। তিনি বলেন আমার প্রতি কারো উপকার হজরত আবু বকর (রা.) অপেক্ষা অধিক নয়। তিনি তার জান-মাল দিয়ে আমার সাহায্য করেছেন উপরন্তু তার কন্যাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। এক রাতে রাসুল (সা.) আবু বকর (রা.) এর দরজায় কড়া নাড়লেন। প্রথম ডাকের সঙ্গে সঙ্গে আবু বকর (রা.) সাড়া দিলেন। রাসুল (সা.) আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তুমি এখনো ঘুমাওনি? আবু বকর (রা.) বললেন আপনি যেদিন হিজরতের কথা বলেছেন সেদিন থেকে আমি আর বিছানায় শরীর লাগাইনি। আমি প্রতিদিন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আপনার অপেক্ষা করি। নবী (সা.) তাঁকে চার মাস আগে হিজরতের কথা বলেছিলেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় রাসুল (সা.) এর সঙ্গে আবু বকর (রা.) তিন দিন ও তিন রাত মক্কার সাওর পাহাড়ের গুহায় ছিলেন।
উমমুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন একরাত আসমানে নক্ষত্ররাজি ঝকঝক করছিল আমি নিবেদন করলাম হে আল্লাহর রসূল! আপনার উম্মতের মধ্যে কারো নেকী বা পূণ্য কি আসমানের তারকারাজির সমান হবে? তিনি বললেন হ্যাঁ আয়েশা! উমর ফারুক (রা.)এর পূণ্যগুলো আসমানের তারকারাজির সমান হবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন আমার ধারণা ছিল যে হুজুর (সা.) আমার আব্বাজানের নাম উল্লেখ করবেন। কিন্তু আমি প্রশ্ন করলাম হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার আব্বাজানের ? হুজুর বললেন বিচলিত হওয়ার কিছু নেই আয়েশা! হজরত আবু বকর (রা.) এর কেবল হিজরত রজনীর পূণ্যগুলো উমর (রা.) এর সমগ্র জীবনের পূণ্যগুলোর অধিক হবে। হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর পক্ষে হুজুর (সা.) এর নৈকট্য লাভের যত সুযোগ হয়েছিল তিনি হুজুর (সা.) এর প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়াদি সম্পর্কে যত বেশি অবহিত ছিলেন এবং হুজুর (সা.) এর প্রতি তার যে গভীর আস্থা ও বিশবাস ছিল তা আর কারো ছিল না। রসূলুল্লাহ (সা.) গভীর রাত পর্যন্ত তার কাছে বসে মুসলমানদের সমস্যাবলী এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতেন এবং অধিকাংশ সময় তার পরামর্শকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করতেন।
বস্তুত যদি কেউ এই বিষয়ের যোগ্য হতো যে হুজুর (সা.) এর দৃষ্টিতে সে অতিপ্রিয় তা হলে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এ বিষয়ে সবচেয়ে যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। হুজুর (সা.) এর নিকট তিনি কত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হুজুর (সা.) এর উল্লিখিত কয়েকটি উক্তি ও মন্তব্য হতে তা সহজে অনুমান করা যায়। রসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট এত বড় মর্যাদার অধিকারী আর কোনো সাহাবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর গোত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অমায়কি ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান। জাহিলী যুগেও কখনো শরাব পান করেননি। তাঁর অমায়িক মেলামেশা,পান্ডিত্য ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্যতা স্থাপন করতো। তাঁর বাড়ীতে প্রতিদিন মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত বৈঠক বসতো।
প্রথম খলীফা আমীরুল মোমেনীন হজরত আবু বকর (রা.) এর দুটি উপাধি সর্বাধিক পরিচিত আবু বকর এবং সিদ্দীক এ দুটি উপাধি জাহেলিয়াত ও ইসলাম উভয় যুগেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে। তার অপর একটি উপাধি ছিল আতীক অতি সুন্দর খুবসুরতকে আতীকও বলা হয়। হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ছিলেন অতি সুদর্শন-সুন্দর। হজরত আবু বকর (রা.) এর জীবনকে দুইভাগে ভাগ করা হয় ইসলামের পূর্বে ও পরের যুগ। মুসলমান হওয়ার পূর্বে তিনি যেমন আরবের সম্মানিত সন্তান ও নানাগুণের অধিকারী ছিলেন তেমনি ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি বহুক্ষেত্রে উচ্চ সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হন। তিনি জাহেলী যুগের আরবে প্রচলিত পাপাচারে কখনও লিপ্ত হননি। ইসলামের আবির্ভাবের এক বছর পূর্বে রসূলুল্লাহ (সা.) এর খেদমতে তার আসা-যাওয়া হতে থাকে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তিনি হুজুর (সা.) এর নির্দেশে তবলীগ প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। বদর, ওহোদ ও হোনায়ন যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভমিকার দৃষ্টান্ত বিরল। তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত আবু বকর (রা.) তার ঘরের সমস্ত সম্পদ হুজুর (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত করেন। হুজুর (সা.) জিজ্ঞাসা করেন পরিবার-পরিজনের জন্য তুমি কি রেখে এসেছো ? জবাবে বললেন আল্লাহ ও তার রসূলকে রেখে এসেছি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণের সম্মান তাকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তিনি রাসূল (সা.) এর শ্বশুর ছিলেন। রাসূলের মৃত্যুর পর তিনি খলিফা হন এবং মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন। রাসূলের মেরাজের ঘটনা এক ব্যক্তির কাছে শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করেছিলেন। মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি অতুলনীয় বিশ্বাসের জন্য তাকে ‘সিদ্দিক’ বা বিশ্বস্ত উপাধি প্রদান করা হয়।
হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর সৌভাগ্য হয়েছিল যে হুজুর (সা.) তাকে হিজরী নবম সালে নিজের প্রতিনিধি রূপে আমীরুল হজ মনোনীত করে মক্কায় প্রেরণ করেন এবং ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ১৭ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা পবিত্র কোরআনের ১৭টি স্থানে ইশারা ইঙ্গিতে বলা হয়েছে। তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, পাতলা ছিপছিপে ও প্রশস্ত ললাট বিশিষ্ট। শেষ বয়সে চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মেহেন্দীর খিজাব লাগাতেন। অত্যন্ত দয়ালু ও সহনশীল ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর মুসলমানগণ আমীরুল মোমেনীন ও খলীফা হিসাবে হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কে মনোনীত করেন। তার খেলাফত কাল ছিল দুই বছর তিন মাস ১১ দিন।
খেলাফতের এই গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণের পর তিনি সর্বপ্রথম যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন সেগুলো হচ্ছে প্রথমত : জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদ দ্বিতীয়ত : নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের মূলোৎপাটন তৃতীয়ত : মুর্তাদন্ড দমন। তাছাড়া কোরআন সংকলন ও হুজুর (সা.) কর্তৃক সর্বশেষ ঘোষিত ওসামা অভিযান পরিচালনা করা যা হুজুর (সা.) এর ওফাতের কারণে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের ফলে খুব সহজেই ধর্মত্যাগীদের ফেতনা দমন করা সম্ভব হয়। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ১৩ হিজরিতে ৬২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। রাসুল (সা.) এর রওজা মোবারকের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। হজরত ওমর ফারুক (রা.) তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন। ইসলামের এই প্রথম খলিফা ও প্রথম মুসলিম পুরুষ চির স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় রয়েছেন। আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট