রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র, ভোটের আগে সন্ত্রাসের সতর্কবার্তা!

কক্সবাজারে নির্বাচনের আগে নাশকতার শঙ্কা

কক্সবাজারভিত্তিক রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। বিশাল এই ক্যাম্পগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা নির্বাচনকালে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অনেক রোহিঙ্গার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে এই সব অস্ত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে ব্যবহার হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে।

এই চিঠির মাধ্যমে সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হল যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সশস্ত্র দল উপস্থিত রয়েছে এবং সেখানে অবৈধ অস্ত্র মজুদ আছে, যা নির্বাচনকালে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য স্থানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারীদের বিভিন্ন সময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ করা হবে। একই দিনে হবে গণভোট। এসব সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আছেন ২৮৫টিতে। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আছেন ২৪৩টি আসনে।

চিঠিতে উদ্বেগ একাধিক

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অপারেশন্স ও পরিকল্পনা পরিদপ্তর থেকে পাঠানো একটি সরকারি চিঠিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী কর্মকাণ্ড থেকে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ জানায়, নির্বাচনকালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে নাশকতার ঝুঁকি, অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, গত ৬ ও ৭ জানুয়ারি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল এবং সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার আলোচনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংক্রান্ত একাধিক উদ্বেগের বিষয় উঠে আসে।

ক্যাম্পে অস্ত্র ও নাশকতার আশঙ্কা

আলোচনায় জানানো হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সশস্ত্র দলের উপস্থিতি রয়েছে এবং সেখানে অবৈধ অস্ত্র মজুদ থাকার তথ্য রয়েছে। এই সশস্ত্র ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনকালীন সময়ে কক্সবাজার কিংবা দেশের অন্যান্য স্থানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

ভোটার তালিকা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার শঙ্কা

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব অবৈধ ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা নির্বাচন-সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন মিছিল, সভা বা গণসংযোগে অংশ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা জানানো হয়।

ক্যাম্প সিল করা বাস্তবসম্মত নয়

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ক্যাম্প সিল করার আহ্বান জানানো হয়। তবে চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্যাম্পের বিশাল আয়তন এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে সীমানা প্রাচীর ও সিসি ক্যামেরার অকার্যকারিতার কারণে পুরো ক্যাম্প সিল করা বাস্তবসম্মত নয়।

প্রস্তাবিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে নাশকতা প্রতিরোধ এবং নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা ঠেকাতে একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত না করার বার্তা দেওয়া এবং এ ধরনের সম্পৃক্ততাকে আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্বাচনের আগে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে ক্যাম্পগুলো থেকে নিকটবর্তী ভোটকেন্দ্রের পথে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে রোহিঙ্গাদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কক্সবাজার শহর ও ক্যাম্পের বাইরের আশপাশের এলাকায় রোহিঙ্গাদের আটক করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়। ক্যাম্পে নিয়োজিত সিআইসিদের নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্পের বাইরে কোনো দায়িত্বে না পাঠিয়ে সাত দিন আগে থেকেই সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়ন, ৮, ১৪ ও ১৬-এর সদস্যদের নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্পের বাইরে দায়িত্ব না দিয়ে ক্যাম্পের নিরাপত্তা, টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রমে নিয়োজিত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের সীমানা প্রাচীর ও সিসি ক্যামেরা মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করে কার্যকর করার কথাও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।

উঠেছে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার যদি আগে থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র দল ও অস্ত্রের উপস্থিতি জানত, তবে এতদিন কেন সেগুলো দমনে বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং কেন নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো। একইভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হলে, কারা এবং কিভাবে তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করল, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নও ওঠেছে।

সিপি

ksrm