চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলায় গত ১২ বছরে বন্য হাতির আক্রমণে নারীসহ অন্তত ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। হাতির আক্রমণে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বনবিভাগ ও কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং বন্যপ্রাণীর করিডোর ধ্বংস হওয়ায় এই সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এছাড়াও ফসলি জমি, গবাদিপশু এবং অন্যান্য সম্পদের ক্ষতির মাত্রাও বেড়েই চলেছে। মূলত বনবিভাগ ও কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে হাতি ও মানুষের সহাবস্থান ক্রমশ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে।
পাহাড়ের কিনারায় থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বনের জায়গায় শিল্পায়ন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনের কারণে হাতির প্রাকৃতিক চলাচলের পথ নষ্ট হয়ে গেছে। বন থেকে খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ জানায়, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৬টি হাতি মারা গেছে, যার বেশিরভাগই মানবসৃষ্ট কারণে। গত তিন বছরে ৯টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৪টি, কক্সবাজারে ৪টি এবং বান্দরবানে ১টি হাতি হত্যা করা হয়েছে।
কর্ণফুলীর বড়উঠান এবং আনোয়ারার বিভিন্ন গ্রাম—যেমন গুয়াপঞ্চক, বৈরাগ, মোহাম্মদপুর, ফকিরখিল, বটতলী ও হাজিগাঁও হাতির পালের প্রধান টার্গেট।
জানা গেছে, গত এক দশকে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় হাতির আক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ ছৈয়দ (৫৭), মো. বদরুদ্দিন (২৯), জালাল আহমদ (৭২), জুয়েল দাশ (৪৫), আবদুর রহমান (৭০), মোমেনা খাতুন (৬৫), আকতার হোসেন চৌধুরী (৫০), আবদুল মোতালেব বাবুল (৬৮), মায়া রাণী বড়ুয়া (৬০), মোহাম্মদ সোলায়মান (৭০), আজিজ ফকির (৭০) এবং মুহাম্মদ ছাবের আহম্মদ (৭৮)। তবে স্থানীয়দের মতে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির করিডোরগুলো ধ্বংস করে বসতি স্থাপন এবং শিল্পায়ন এ সমস্যার মূল কারণ।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) জানায়, ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে বন্য হাতির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬৮টি। এর মধ্যে বেশির ভাগ হাতি চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ। করিডোর সংকুচিত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের (কেইপিজেড) বিস্তৃত কার্যক্রমও এ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, হাতির কারণে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কেইপিজেডের সম্প্রসারণই হাতির করিডোর নষ্ট করেছে। কেইপিজেডের আশপাশে কর্মরত প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকও এখন হাতির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষজ্ঞ কমিটি সাতটি সুপারিশ করেছেন। এতে হাতি-মানুষ সংঘাত কমাতে সোলার ফেন্সিং স্থাপন, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালু এবং ইলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি খুবই ধীর।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকিল বলেন, ‘হাতি আমাদের জন্য যমদূত হয়ে ওঠেছে। প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকতে হয়। বনবিভাগের গাফিলতিতে আমরা বিপদের মুখে পড়েছি।’
আরেকজন বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ টিপু জানান, ‘কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ হয়তো হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তারা আমাদের ক্ষতিপূরণ বা নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।’
বড়উঠান ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, ‘আমি বারবার বনবিভাগ ও কেইপিজেডকে জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। মানুষ মারা যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে, অথচ কোনো উদ্যোগ নেই।’
কেইপিজেড প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মঈনুল আহসান বলেন, ‘হাতির কারণে আমাদের শ্রমিকরা আতঙ্কে থাকেন। বাগান ও স্থাপনার ক্ষতি হচ্ছে। তবে আমরা হাতির আক্রমণ ঠেকানোর উপায় খুঁজছি।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার সুমী বলেন, ‘আমি যোগদান করেছি মাত্র কিছুদিন হলো। বিষয়টি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট কনসার্ন আছি। যোগদানের পরপর এটা নিয়ে আমরা ইন্টার্নালি বসেছিলাম। সুতরাং জনস্বার্থে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।’
বনবিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘হাতির আক্রমণে কেউ মারা গেলে সরকার তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। আহত হলে দেওয়া হচ্ছে এক লাখ টাকা। ফসল বা বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।’ তবে স্থানীয়রা বলছেন, এই ক্ষতিপূরণ প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় খুবই সামান্য।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ‘জনজীবন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় আমরা সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছি। আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার কেইপিজেড এলাকায় মানুষ ও হাতির সুরক্ষাকল্পে বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনও নেওয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, ‘হাতির করিডোর সুরক্ষিত করতে সোলার ফেন্সিং ও আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কর্ণফুলী ও আনোয়ারার মতো এলাকায় বনভূমি ও করিডোর সুরক্ষা না করলে সংঘাত আরও বাড়বে।’
বন ও পরিবেশবিদ ড. সুপ্রিয় চাকমা বলেন, ‘হাতির করিডোর পুনর্গঠন এবং সোলার ফেন্সিং সিস্টেম চালু করা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি বনাঞ্চল সুরক্ষা এবং স্থানীয়দের সচেতন করার ওপর জোর দিতে হবে। এ উদ্যোগগুলো নিতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বও প্রয়োজন।’
ডিজে