দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের চারটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অপারেটরের নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২০ সালে সরকার চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে বিদেশি কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া, নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে আগামী ডিসেম্বরে চুক্তি স্বাক্ষর করবে সরকার। এর মধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল ৩০ বছরের জন্য, আর বাকি দুটি টার্মিনাল ২৫ বছর মেয়াদে বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে দুর্নীতিমুক্ত এবং উচ্চ কার্যক্ষমতা সম্পন্ন লজিস্টিক সিস্টেম তৈরি হবে। গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পোর্ট পরিচালিত হলে বাংলাদেশি কর্মী ও ব্যবস্থাপনা দলও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।
বন্দর বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
চট্টগ্রাম বন্দরে একটি গ্লোবাল অপারেটর কেন জরুরি হলো?
বাংলাদেশের বন্দরে মূল চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি এবং দীর্ঘ ওয়েটিং টাইম। প্রতিযোগী দেশগুলো, যেমন ভিয়েতনাম, বৈশ্বিক অপারেটর দ্বারা প্রযুক্তি–নির্ভর বন্দর ব্যবস্থাপনা চালু করে তাদের কাই মেপ বন্দরকে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে সপ্তম অবস্থানে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে ৩৩৪তম স্থানে। এমন অপারেটর প্রয়োজন, যারা নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করতে পারে। তরুণ জনশক্তি তাদের কাছ থেকে পোর্ট পরিচালনা শিখে ভবিষ্যতে দেশে–বিদেশে নেতৃত্ব দিতে পারবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটি দুর্নীতিমুক্ত বন্দর পাওয়ার সম্ভাবনা।
পোর্টের মালিকানা কি বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে?
মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। লালদিয়া চরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস একটি নতুন টার্মিনাল নকশা ও নির্মাণ করবে। নির্মিত বিশ্বমানের এই টার্মিনালের মালিক হবে বাংলাদেশ। নির্মাণকাল তিন বছর। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে এপিএম–এর হাতে। সময় শেষ হলে তারা সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাবে।
এপিএম টার্মিনালস কারা? এদেরকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো?
এপিএম টার্মিনালস এপি মোলার–মেয়ার্স্ক গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরের ১০টি তারা পরিচালনা করে। ৩৩টি দেশে ৬০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। ইউরোপ, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও চীনে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
চুক্তির মূল শর্তগুলো কী কী?
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল একটি পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প। প্রাইভেট পার্টনার এপিএম সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণকালে মোট প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সরকার কোনো অর্থায়ন বা গ্যারান্টি দিচ্ছে না। নির্মাণ শেষে ৩০ বছরের জন্য চুক্তি থাকবে এবং শর্ত মানলে মেয়াদ বাড়ানো যাবে। যত বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল হবে, তত বেশি আয় হবে সরকারের। কনটেইনার হ্যান্ডেল না করতে পারলেও নির্দিষ্ট ন্যূনতম ভলিউম ধরে পেমেন্ট দিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
৩০ বছরের চুক্তি কি অনেক বেশি?
পিপিপি কাঠামোয় ৩০ বছরকে মাঝারি মেয়াদ ধরা হয়। অন্যান্য দেশে একই ধরনের চুক্তি আরও দীর্ঘ মেয়াদে হয়ে থাকে। যেমন ভারতের মুম্বাই পোর্টে ৬০ বছর, চীনের সাংহাই পোর্টে ৫০ বছর এবং ভিয়েতনামের কাই মেপ পোর্টে ৫০ বছর মেয়াদে চুক্তি হয়েছে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না?
পিপিপি চুক্তির দলিল সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা কোনো দেশেই প্রচলিত নয় আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে। ভবিষ্যৎ দরপত্র প্রক্রিয়া ও দরকষাকষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য মূল দলিল প্রকাশ করা যায় না। চুক্তিতে ব্যবসায়িক তথ্য, অপারেশনাল কৌশল ও গোপনীয় উপাদান থাকে। বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবি–ও পূর্ণ দলিল প্রকাশ না করে সারাংশ প্রকাশের পরামর্শ দেয়। লালদিয়ার ক্ষেত্রেও সেই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে মালিকানা ও আয় কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
অপারেটর বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কি স্বচ্ছ ও আইনানুগ ছিল?
পিপিপি নীতিমালার জি–টু–জি পদ্ধতির আওতায় টেন্ডার আহ্বান, প্রাক–যোগ্যতা যাচাই, টেকনিক্যাল ও ফিনান্সিয়াল মূল্যায়ন এবং ডিউ ডিলিজেন্স সম্পন্ন করে অপারেটর চূড়ান্ত করা হয়েছে। নিরপেক্ষ টেকনিক্যাল পরামর্শক, আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হয়েছে এবং আন্তমন্ত্রণালয় টেন্ডার কমিটি প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছে।
আমরা কি শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটছি?
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর চীনা ঋণে নির্মিত হয়েছিল এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ৯৯ বছরের জন্য ইকুইটি হস্তান্তর করতে হয়। লালদিয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি; সম্পূর্ণ বিনিয়োগ এপিএম–এর। মালিকানা রাষ্ট্রের। চুক্তিতে ঝুঁকি বণ্টন, মুদ্রা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্টেপ–ইন রাইট স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যা কাঠামোকে টেকসই করে।
অপারেটর ব্যর্থ হলে বা চুক্তি ভঙ্গ করলে কী করবে সরকার?
চুক্তিতে পারফরম্যান্স–ভিত্তিক সূচক, রেমেডি ও পেনাল্টি, স্টেপ–ইন রাইট, টার্মিনেশন ও হ্যান্ড–ব্যাকের ধারা রয়েছে। অপারেটর ব্যর্থ হলে সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে।
বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সমস্যা না মিটিয়ে নতুন টার্মিনাল কেন?
বর্তমান টার্মিনালগুলোতে ডিজিটাইজেশন, ইয়ার্ড রিডিজাইন ও গেট অপটিমাইজেশন চলছে। লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে অপারেশনাল প্রতিযোগিতা বাড়বে। বন্দর অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো ও বটলনেক দূর করা জরুরি, তাই নতুন প্রকল্প প্রয়োজন।
সবকিছু এত দ্রুত হচ্ছে কেন?
এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলেও তা স্বাভাবিক প্রশাসনিক উদ্যোগের অংশ। দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রকল্পে মনোযোগী কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অগ্রগতি এসেছে।
আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি?
নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল অপরিবর্তিত থাকবে। টার্মিনালের পুরো প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল প্রক্রিয়ায় ডেটা লোকালাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোল নিশ্চিত করা হবে। সবকিছু সরকারের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।
সব মিলিয়ে দেশের কী লাভ হবে?
অতিরিক্ত আট লাখ টিইইউ ধারণক্ষমতা যুক্ত হবে, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে এবং আমদানি–রপ্তানি দ্রুততর হবে। দ্বিগুণ বড় কনটেইনার জাহাজ ভিড়তে পারবে। বিশ্বের দূরবর্তী দেশের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ সংযোগ তৈরি হবে। নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০–৭০০ জনের সরাসরি এবং আরও বহুজনের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকেরা বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবেন। ডিজিটাল অপারেশন সিস্টেম ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়বে। এটি দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব গ্রিন পোর্ট হবে।


