চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবপাচার বিরোধী আইন নিয়ে যৌথ আলোচনা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবপাচার প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে আইন শিক্ষায় ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও আইন পেশাজীবীরা। তারা বলেছেন, মানবপাচার মোকাবিলায় কার্যকর বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের ট্রমা-সচেতন, লিঙ্গ-সংবেদনশীল ও বাস্তবমুখী দক্ষতায় প্রস্তুত করা জরুরি।

বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের এ কে খান অডিটোরিয়ামে ‘এডুকেটিং ফর জাস্টিস: এমপাওয়ারিং ল’ গ্র্যাজুয়েটস টু ফাইট হিউম্যান ট্রাফিকিং’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানবপাচার বিরোধী আইন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, তদন্ত ও প্রমাণ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে শোষণের মতো নতুন প্রবণতার বিষয়ও উঠে আসে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে। শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অনুষ্ঠানে কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ সময় আইওএমের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে রেফারেন্স বই হস্তান্তর করা হয়। আয়োজকেরা জানান, মানবপাচার প্রতিরোধে যুবসমাজ ও একাডেমিয়ার ভূমিকা জোরদার করতে আইওএম ধারাবাহিকভাবে এমন উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ‘সেফগার্ডিং লাইভস–হিউম্যান ট্রাফিকিং প্রিভেনশন’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়েছে।

সেমিনারের শেষে আইন অনুষদের সেমিনার হলে আইওএমের সহায়তায় এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি কোইকার অর্থায়নে আইটি সরঞ্জামসহ একটি বুক কর্নার উদ্বোধন করা হয়। আয়োজকদের মতে, এটি মানবপাচার বিরোধী বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়ক হবে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম. জাফর উল্লাহ তালুকদার এবং আইওএমের হেড অব প্রোটেকশন পূজা ভাল্লা একাডেমিক প্রতিষ্ঠান ও বিচার খাতের অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

মূল প্রবন্ধে আইন বিভাগের অধ্যাপক এ.বি.এম. আবু নোমান মানবপাচার বিষয়ক আইন স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যাতে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ-৩) মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়সংক্রান্ত বাস্তব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ-১) মো. জসীম উদ্দিন খান। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের শুধু আইন ও বিধি জানা যথেষ্ট নয়; বিশ্লেষণী সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ডের সমন্বয় অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাসঙ্গিক তথ্য, প্রমাণ ও বাস্তব প্রেক্ষাপটের সুপরিকল্পিত মূল্যায়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সেমিনারটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত একটি বিস্তৃত সেমিনার সিরিজের অংশ। এর লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও বিচার খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা জোরদার করা এবং আইওএম প্রণীত মানবপাচার আইন মডিউল স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একাডেমিক প্রস্তুতি তৈরি করা। আয়োজকদের মতে, এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার, ফৌজদারি বিচার ও মানবপাচার প্রতিরোধে পেশাগত পথে এগোতে উৎসাহিত করবে এবং একটি আরও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক জাতীয় বিচার ব্যবস্থায় অবদান রাখবে।

ksrm