চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের চরফরিদ খাল। একটা সময় ছিল যখন এখানে চলত বড় বড় সাম্পান, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, পালতোলা পানসি, সওদাগরি নৌকা। তবে এখন তা শুধুই স্মৃতি। বিষাক্ত বর্জ্যে হালে বিপর্যস্ত চরফরিদ খাল। শুধু চরফরিদ খাল নয়, বিষাক্ত বর্জ্যে এখন কঠিন অবস্থা কর্ণফুলী উপজেলার বাকি ১৩ খালেরও।
খালের দু’পাড়ে গড়ে ওঠা শত শত পশু খামারের বর্জ্য ফেলায় বন্ধ হয়ে গেছে খালের পানিপ্রবাহ। পানির রঙ কালো হয়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
বেশ কয়েকজন খামারি জানান, কর্ণফুলী উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন গোবর উৎপাদন হয়। এই গোবর অন্য উপজেলা বা জেলার জন্য সম্পদ হলেও কর্ণফুলীর জন্য বোঝা।
অতীতে কর্ণফুলী উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে ১৪টি খাল সচল ছিল। উপজেলার চারদিক ঘিরে বয়ে যাওয়া কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে মিলিত ছিল এসব খাল।
ওই সময়ে নৌপথে আনা-নেওয়া করা হতো পণ্য। নৌপথে ছিল বাণিজ্যিক যোগাযোগও। কিন্তু ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালীদের দখল-দূষণে এখন সংকটাপন্ন ১৪টি খাল। সবচেয়ে খারাপ অবন্থা চরফরিদ খালের।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, খালের পানিতে এত দুর্গন্ধ যে, আমরা জমিতে ব্যবহার করতে পারি না। আগে এই পানিতেই চাষাবাদ করতাম। এখন বৃষ্টির পানির ওপরই নির্ভর করতে হয়।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ডা. রুমন তালুকদার জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেইরি জোন কর্ণফুলী। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টন ডেইরি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণ করছে। এই বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করা গেলে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অন্যদিকে বর্তমান প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাকিবুল ইসলাম বলেন, খালের জন্য কি খামার বন্ধ করে দেব? বর্ষাকাল নয় বলে হয়তো পানিপ্রবাহ নেই। আমি খামারিদের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করতে বলব।
সরেজমিন দেখা গেছে, খালের পাড় ভরাট করে গড়ে উঠেছে গরুর খামার। একদিকে সড়ক, অন্যদিকে বর্জ্যে ভরাট খাল। এসব কারণে বহু আগে থেকেই জোয়ারের পানিপ্রবাহ বন্ধ।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খামারি হারুন চৌধুরী বলেন, আমরা ৩০০টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা করছি। তবে খামারিদের পক্ষে এত বিশাল ডেইরি বর্জ্য সামলানো অসম্ভব। প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার।
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, কর্ণফুলীতে যে পরিমাণ গোবর উৎপন্ন হয়, তা পুরোপুরি ভার্মি কম্পোস্ট করা প্রায় অসম্ভব। তবে জমিতে সরাসরি পঁচিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এদিকে খাল দখল-দূষণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতির সভাপতি এসএম পেয়ার আলী। তিনি বলেন, কর্ণফুলীর খালগুলো দখল ও দূষণের কারণে সংকটাপন্ন। এগুলো উদ্ধার করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
এর আগে এক মতবিনিয়ম সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা জান্নাত মন্তব্য করেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে সম্পদও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তিনি কর্ণফুলীর খালগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্গানিক সার প্রকল্প কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ওই মতবিনিময় সভায় জানান।
নদী নিরাপত্তা সংগঠন নোঙর প্রতিনিধি সুমন শামস বলেন, সিএস-আরএস ম্যাপ অনুযায়ী খালগুলো চিহ্নিত করা এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ দায়িত্ব মূলত জেলা প্রশাসকের, তবে উপজেলা প্রশাসনও উদ্যোগ নিতে পারে।
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাদি উর রহিম জাদিদ বলেন, জেলা প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে খাল উদ্ধারকাজ করছে। নকশা দেখে চরফরিদসহ অন্যান্য খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।